প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি বাস্তবায়নের প্রধান কর্মকর্তা টম হোম্যান জানিয়েছেন, ফেডারেল অভিবাসন-প্রয়োগকারী দল ইতোমধ্যেই নিউইয়র্ক সিটিতে অভিযান চালাচ্ছে এবং নতুন এজেন্টদের আরও মোতায়েন করা হচ্ছে। এই সতর্কবার্তা আসে নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানির শপথের আগের প্রাক্কালে, যা শহরের অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
টম হোম্যান এক সাক্ষাৎকারে বলেন, শহরের ‘সাংকচুয়ারি’ নীতি মোকাবিলায় প্রশাসন কঠোর অবস্থান নেবে। তিনি বলেন, “আমরা নিউইয়র্ক সিটিতে আসছি। আমাদের লক্ষ্য, যেখানে জননিরাপত্তার জন্য হুমকি রয়েছে বা আইনি বাধা লঙ্ঘন হচ্ছে, সেইসব ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ যদি সহযোগিতা না করে, আমাদের এজেন্টরা স্বতঃসিদ্ধভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।”
তিনি আরও জানান, ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) এজেন্টরা ইতোমধ্যেই মাঠে নেমেছে এবং রাইকার্স আইল্যান্ড জেলের প্রবেশাধিকার বিষয়ে পূর্বের চুক্তি বাতিল হওয়ার পর তাদের উপস্থিতি বাড়ানো হবে। হোম্যানের কথায়, “শহরে সহস্রাধিক অতিরিক্ত আইসিই পুলিশ মোতায়েন করা হচ্ছে। ১ জানুয়ারি মামদানির শপথের আগেই তারা রাস্তায় কার্যক্রম শুরু করবে।”
নিউইয়র্ক সিটির নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি ইতিমধ্যেই হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন শহরের ঘরভাড়া সংকট এবং ফেডারেল সহায়তার বিষয়ে আলোচনার জন্য। মামদানি বলেন, “আমার লক্ষ্য হলো শহরের আর্থসামাজিকভাবে দুর্বল জনগণকে সহায়তা করা। আমরা যে কারও সঙ্গে আলোচনা করতে প্রস্তুত।” যদিও তিনি ডেমোক্র্যাটিক সমাজতন্ত্রের নীতিতে বিশ্বাসী, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তার সমন্বয় কিছুটা নমনীয় হলেও, অভিবাসীদের আইনি সহায়তার জন্য ১৬৫ মিলিয়ন ডলারের বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন স্ট্যাটেন আইল্যান্ডের একটি কোস্ট গার্ড স্থাপনায় নতুন অভিবাসী আটক কেন্দ্র খোলার বিষয় বিবেচনা করছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কর্মকর্তারা ফোর্ট ওয়াডসওর্থ ঘাঁটি পরিদর্শন করেছেন। বর্তমানে নিউইয়র্কে গ্রেফতার হওয়া অনেক অভিবাসীকে রাজ্যের বাইরে বিভিন্ন কেন্দ্রেও পাঠানো হচ্ছে।
নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুল সাংবাদিকদের বলেন, ট্রাম্প যে পদক্ষেপ নেন, তা শহরের অর্থনীতির জন্য বিপরীত প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে। তিনি সতর্ক করেন, “নিউইয়র্ক সিটি দেশের আর্থিক কেন্দ্র। এখানে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে তার ফল ভোগ করতে হবে।” গভর্নরের কথায়, শহরের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে তারা সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয় ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে তুলে ধরবেন।
ট্রাম্প ইতিমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ অভিবাসন অভিযান পরিচালনা করবেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আইসিই মূলত লস অ্যাঞ্জেলেস, শিকাগো এবং বস্টনের মতো ডেমোক্র্যাটশাসিত শহরে নজর রেখেছে। তবে নিউইয়র্কে এজেন্সির উপস্থিতি এখনো তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আইসিই ও অন্যান্য ফেডারেল সংস্থা নর্থ ক্যারোলাইনাতেও অভিযান জোরদার করেছে। হোম্যানের বক্তব্যের পর ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি জানায়, শার্লট এলাকায় অভিযানে ২০৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, অভিযানের সময় শপিং সেন্টার, কান্ট্রি ক্লাব, গির্জা ও অন্যান্য জনসমাগম স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে।
নিউইয়র্কের র্যালির মেয়র জ্যানেট কাওয়েল জানান, তাকে সতর্ক করা হয়েছে যে ফেডারেল অভিবাসন এজেন্টরা শহরে প্রবেশ করতে পারে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
হোম্যান্ড সিকিউরিটি জানায়, জানুয়ারির শেষ থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ৫ লাখ ৫০ হাজারের বেশি বহিষ্কার কার্যকর করা হয়েছে। আইসিইর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২১ জানুয়ারি থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অপসারণ করা হয়েছে। যদিও দুটি তথ্যের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে এবং এ বিষয়ে ডিপার্টমেন্ট কোনো ব্যাখ্যা প্রদান করেনি।
নিউইয়র্ক শহরে এই অভিযান নিয়ে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, আইসিইর ক্র্যাকডাউন শহরের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করবে। বিশেষ করে অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শপথের আগে এই অভিযান নিউইয়র্কের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে আরও জটিল করে তুলবে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, আইসিই এবং অন্যান্য ফেডারেল সংস্থার উপস্থিতি শহরের রাস্তায় দৃশ্যমান হলেও, বড় ধরনের জনঅবরোধ এবং অভ্যন্তরীণ বিরোধের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই স্থানীয় প্রশাসন ও ফেডারেল সংস্থার মধ্যে সমন্বয় অপরিহার্য। নিউইয়র্কের অর্থনৈতিক কেন্দ্রের ক্ষতি এড়াতে দুই পক্ষের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
সর্বশেষে বলা যায়, আইসিইর ক্র্যাকডাউন ও নবনির্বাচিত মেয়রের শপথের প্রাক্কালে এই অভিযান নিউইয়র্ক সিটির রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। ফেডারেল সরকারের কঠোর অবস্থান, স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া এবং অভিবাসী সম্প্রদায়ের উদ্বেগ মিলিয়ে শহরে উত্তেজনা এবং অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। তবে দেশের আইন ও ন্যায়বিচারের প্রয়োজনে এই অভিযান কার্যক্রম চলমান থাকবে বলে প্রত্যাশিত।










