ইরানের সঙ্গে এক সপ্তাহও যুদ্ধ চালাতে পারবে না ইসরাইল

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২১ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১৯ বার
ইরানের সঙ্গে এক সপ্তাহও যুদ্ধ চালাতে পারবে না ইসরাইল

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরান ও ইসরাইলের দীর্ঘদিনের উত্তপ্ত সম্পর্ক ও অন্তর্দ্বন্দ্ব নতুন করে আলোচনায় এসেছে ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর। শুক্রবার ইমাম খোমেনি সমাধিস্থলে বসিজ স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর এক সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে গালিবাফ দাবি করেন, ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে এক সপ্তাহও যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম নয়। তার মন্তব্য ঘিরে দেশটির সরকারি মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম হয়েছে।

গালিবাফ তার বক্তব্যে সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, জুন মাসের দ্বিপাক্ষিক সংঘর্ষ এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, গত জুনে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে যে ১২ দিনের আগ্রাসন শুরু করেছিল, তা ইরানের শক্তির সামনে টিকতে পারেনি। তার দাবি, ইরানি জনগণের ঐক্য, মনোবল ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রস্তুতি ইসরাইলি আগ্রাসনকে প্রতিহত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেই যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় বলে উল্লেখ করেন তিনি।

গালিবাফ বলেন, ইরানের শক্তি কখনোই শুধু ক্ষেপণাস্ত্র বা উন্নত সামরিক সরঞ্জামের দিক থেকে পরিমাপ করা উচিত নয়। প্রকৃত শক্তি দেশের জনগণের সমর্থন, বিশ্বাস ও মনোবল থেকে আসে। তিনি মন্তব্য করেন, যদি দেশের মানুষের হৃদয় সরকার ও রাষ্ট্রের পাশে থাকে, তাহলে ইরান বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তবে জনগণের সমর্থন না পেলে কোনো সামরিক শক্তিই কার্যকর থাকতে পারে না। তার বক্তব্যে জনগণের ঐক্যকে জাতীয় নিরাপত্তার মূল উপাদান হিসেবে তুলে ধরা হয়।

জুনের সংঘর্ষ প্রসঙ্গে গালিবাফ বলেন, যুদ্ধের প্রথম দিনের ক্ষতি ছাড়া পরবর্তী ছয়দিনে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেই আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে সংঘাত থামানোর প্রস্তাব দেন, যা প্রমাণ করে এই ১২ দিনের যুদ্ধ ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও চাপের কারণ হয়ে ওঠে। এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপট থেকেই বোঝা যায়, ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সহায়তা ছাড়া ইরানের সাথে দীর্ঘ সময় যুদ্ধ পরিচালনা করতে সক্ষম নয়।

গালিবাফ আরও দাবি করেন, ইরানের হাতে ইসরাইলি শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের মার্কিন সমর্থকেরা পরাজিত হয়েছে। যদিও আন্তর্জাতিক মহলের বিভিন্ন সূত্র এই সংঘর্ষের ঘটনাবলি নিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছিল, তবুও গালিবাফের বক্তব্যে পরিষ্কার যে ইরান সেই সংঘর্ষকে নিজের সামরিক ও কৌশলগত বিজয় হিসেবেই দেখে।

শত্রু পক্ষের কৌশলের বিষয়ে তিনি বলেন, সামরিক শক্তি দিয়ে আক্রমণ চালানো হচ্ছে ঠিকই, তবে পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, ভুয়া তথ্য প্রচার ও প্রচারণার মাধ্যমে ইরানি জনগণকে বিভ্রান্ত করারও চেষ্টা চলছে। তার দাবি, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তি ইরানের সামাজিক কাঠামো ও মানুষের বিশ্বাস নষ্ট করার উদ্দেশ্যে নানা উপায়ে চাপ সৃষ্টি করছে। তবে জনগণকে ইসলামি ব্যবস্থার পাশে রাখাই বারবার সাফল্যের মূল কারণ বলে মন্তব্য করেন তিনি। জাতীয় ঐক্য ও ধারাবাহিক প্রতিরোধ ক্ষমতা ইরানকে যেকোনো বৈরী শক্তির বিরুদ্ধে টিকিয়ে রেখেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

গালিবাফ তার বক্তৃতায় আরও বলেন, ইরান শুধু সামরিকভাবে শক্তিশালী দেশ নয়, বরং আদর্শ, বিশ্বাস এবং জনগণের সম্মিলিত মানসিক শক্তিও তাদের অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তিনি বলেন, শত্রুদের প্রতিটি আঘাতের জবাব দিতে ইরান প্রস্তুত। ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের মূল লক্ষ্য দেশকে যেকোনো বিদেশি আগ্রাসন থেকে নিরাপদ রাখা। তিনি সতর্ক করেন, ভবিষ্যতে যদি আবারও কোনো সংঘাত শুরু হয়, ইরান এবার আরও শক্তভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে।

তার বক্তব্যের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা। তিনি দাবি করেন, ইসরাইল কোনোভাবেই একা ইরানের মোকাবিলা করতে পারে না। গত সংঘর্ষে ইসরাইল ন্যাটোর গোয়েন্দা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পেয়েছিল, যা ছাড়া যুদ্ধ কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের পরাজয়ের দিকে নিয়ে যেত। তিনি বলেন, ইসরাইলের প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন রয়েছে, যা তাদের টিকে থাকতে সাহায্য করে।

তার বক্তব্য শুধু সামরিক বা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি জনগণকে আশ্বস্ত করে বলেন, ইরানের ভেতরে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে যে সজাগতা এখন গড়ে উঠেছে, তা দেশের ভবিষ্যৎকে আরও নিরাপদ করবে। তিনি বসিজ বাহিনীকে দেশের সামাজিক নিরাপত্তা, ঐক্য ও মানবিক সহায়তামূলক কাজে আরও ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

ইরান-ইসরাইল সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই উত্তেজনা আরও তীব্র হয়েছে। উভয় দেশই বিভিন্ন সময়ে একে অপরকে নানা অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে। কখনো সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আঘাত, কখনো সাইবার যুদ্ধ, আবার কখনো রাজনৈতিক ও সামরিক হুমকি—দু’দেশের সম্পর্ক সবসময়ই উত্তপ্ত থেকেছে।

গালিবাফের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে অনেকেই ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখছেন। দেশটিতে নেতৃত্ব ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে এমন বক্তব্য দেওয়া হয়ে থাকে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। তবে বক্তৃতাটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতেও নতুন ব্যাখ্যা যোগ করেছে, বিশেষত যখন ইসরাইলের ভেতরে রাজনৈতিক সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ইরানের সামরিক সক্ষমতা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে ইসরাইল নানা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করার চাপের মুখে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গালিবাফের বক্তব্য ইরান তাদের আত্মবিশ্বাস ও কৌশলগত অবস্থান তুলে ধরেছে।

তবে ইসরাইল বা যুক্তরাষ্ট্র এখনো গালিবাফের দাবি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। আন্তর্জাতিক মহল এ ধরনের বক্তব্যকে মধ্যপ্রাচ্যের স্বাভাবিক রাজনৈতিক উত্তাপের অংশ হিসেবেই দেখছে।
তবে এক বিষয় স্পষ্ট—ইরান ও ইসরাইলের দীর্ঘদিনের বৈরিতা ও শক্তি-প্রদর্শন ভবিষ্যতে আরও বড় কোনো সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এই অবস্থায় উভয় পক্ষের কৌশলগত পরিকল্পনা, রাজনৈতিক অবস্থান ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ ভূ-রাজনৈতিক চিত্রকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত