প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
আমাদের শরীরে এমন কিছু অঙ্গ রয়েছে, যেগুলো নীরবেই প্রতিদিন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে যায়—তাদের মধ্যে অন্যতম হলো কিডনি। প্রতিদিন আমাদের শরীরে জমে থাকা বর্জ্য পদার্থ ছেঁকে ফেলে দিয়ে রক্তকে বিশুদ্ধ রাখার পাশাপাশি কিডনি নিয়ন্ত্রণ করে শরীরের তরল, খনিজ ও অ্যাসিডের ভারসাম্য। অথচ কিডনির অসুস্থতা শুরু হলে বেশিরভাগ সময়ই তা প্রথমে চোখে পড়ে না। চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগেই যদি আমরা কিছু প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন হই, তবে সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব।
সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য ও আন্তর্জাতিক মেডিকেল জার্নালগুলো বিশ্লেষণ করে একাধিক গবেষণা সংস্থা জানিয়েছে, কিডনির প্রাথমিক সংকেত শনাক্ত করা গেলে এটি দীর্ঘমেয়াদে রক্ষা করা সম্ভব। চিকিৎসকেরা মনে করছেন, প্রতিদিনের জীবনে কিছু স্বাভাবিক লক্ষণ খেয়াল রাখলেই অনেকাংশে বোঝা সম্ভব কিডনি ঠিকঠাক কাজ করছে কি না।
প্রথমত, সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি নিঃশ্বাসে তীব্র দুর্গন্ধ বা অ্যামোনিয়ার মতো গন্ধ না থাকে এবং মুখে কোনো অস্বাভাবিক শুকনোভাব বা বিস্বাদ না পাওয়া যায়, তবে ধরে নেওয়া যায় রক্তের বর্জ্য অপসারণে কিডনি স্বাভাবিকভাবেই সক্রিয় রয়েছে। কারণ কিডনি যখন ইউরিয়া ও অন্যান্য বর্জ্য যথাযথভাবে ফিল্টার করতে পারে না, তখন নিঃশ্বাসের সঙ্গে গন্ধযুক্ত রাসায়নিক বের হয়ে মুখে দুর্গন্ধ তৈরি করে।
দ্বিতীয়ত, শরীরে যদি সারাদিন স্বাভাবিকভাবে প্রাকৃতিক শক্তি বজায় থাকে—মাথা ঘোরা, চোখ জ্বালা বা অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভূত না হয়, তবে কিডনির তৈরি হরমোন ইরিথ্রোপয়েটিন ঠিকভাবে কাজ করছে। এই হরমোন রক্তে লাল কণিকা তৈরির মাধ্যমে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ায় এবং শারীরিক ক্লান্তি দূর করে। অনিয়ন্ত্রিত কিডনি কার্যক্রম থাকলে দেখা যায় অল্পতেই শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মস্তিষ্ক ঝিম ধরে।
তৃতীয়ত, আমাদের ত্বকের অবস্থাও কিডনির কার্যক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। যদি অতিরিক্ত লোশন ছাড়া ত্বক মসৃণ ও আর্দ্র থাকে, বিশেষ করে হাত-পা ও পায়ের পেছনে, তবে বুঝতে হবে দেহের তরল ও খনিজের ভারসাম্য ঠিক রয়েছে। কিডনি সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের নিয়ন্ত্রণে সরাসরি ভূমিকা রাখে এবং এ ভারসাম্য ঠিক থাকলে ত্বক থাকে স্বাভাবিক ও নমনীয়।
চতুর্থ সংকেত হিসেবে চিকিৎসকেরা উল্লেখ করেন সকালবেলার চোখ বা মুখে ফোলাভাব। যদি দেখা যায় ঘুম থেকে উঠেই চোখের নিচে অস্বাভাবিক ফোলা ভাব বা মুখমণ্ডল পাফি হয়ে গেছে, তবে সেটি কিডনির তরল অপসারণ প্রক্রিয়ার ব্যর্থতার ইঙ্গিত হতে পারে। কিন্তু ফোলাভাব না থাকলে, ধরে নেওয়া যায় কিডনি রাতভর অতিরিক্ত তরল সঠিকভাবে ছেঁকে বের করতে পেরেছে।
পঞ্চমত, শরীরে পেশিতে খিঁচ ধরা বা টান লাগা, বিশেষ করে রাতে ঘুমের সময়, তা শুধু পেশির ক্লান্তি নয়, ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতার লক্ষণও হতে পারে। কিডনি পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও ক্যালসিয়ামের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। এই উপাদানগুলোর ভারসাম্য সঠিক থাকলে পেশি থাকে স্বাভাবিক, খিঁচ বা টান ধরা দেখা যায় না।
এছাড়াও বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনি ভালো রাখতে হলে কয়েকটি জীবনাচার অনুসরণ করাও জরুরি। নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি পান, উচ্চ প্রোটিন ও লবণ সীমিত করে খাওয়া, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধূমপান ও অপপ্রয়োজনে ওষুধ সেবন না করা, এবং বছরে অন্তত একবার কিডনি পরীক্ষা করানো—এসব অভ্যাস কিডনির দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা নিশ্চিত করে।
পুষ্টিবিদরা সতর্ক করে বলেন, শুকনো ফল সবসময় স্বাস্থ্যকর হলেও কিডনি রোগীদের জন্য এগুলো সবসময় উপকারী নয়। বিশেষ করে খেজুর, কিশমিশ বা শুকনো অ্যাপ্রিকটের মতো ফল যেগুলোতে পটাশিয়াম ও ফসফরাসের মাত্রা বেশি, তা এড়িয়ে চলা উচিত। তবে আখরোট বা ম্যাকাডেমিয়া নাট কম পটাশিয়ামযুক্ত বলে সীমিত পরিমাণে গ্রহণ করা যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত, আমাদের কিডনি তার কাজ নীরবেই করে, কিন্তু একবার যদি সমস্যা শুরু হয়, তখন তা হয়ে উঠতে পারে ভয়াবহ। তাই সময় থাকতে সচেতন হওয়া, উপসর্গগুলো নজরে রাখা এবং জীবনাচার পরিবর্তনের মাধ্যমে কিডনিকে সুস্থ রাখা সম্ভব। আর কিডনি ভালো থাকলেই শরীরের ভারসাম্য থাকবে সঠিক, কর্মক্ষমতাও বজায় থাকবে দীর্ঘকাল।