প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
লা লিগার চলতি মৌসুমে শিরোপা লড়াই এখন আরও রোমাঞ্চকর ও টানটান উত্তেজনায় ভরা। টানা দুই ম্যাচে পয়েন্ট খোয়ানো রিয়াল মাদ্রিদ নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে ব্যর্থ হয়ে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনাকে আরও কাছে আসার সুযোগ করে দিয়েছে। নিজেদের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে এলচের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করে লিগের শীর্ষস্থান ধরে রাখলেও ক্ষণে ক্ষণে মাদ্রিদের এই সমতা যেন তাদের আত্মবিশ্বাসে কাঁপন ধরিয়েছে। এর আগেই চ্যাম্পিয়ন্স লিগে লিভারপুলের কাছে হার, তারপর লা লিগায় টানা দুই ম্যাচ ড্র—সব মিলিয়ে তিন ম্যাচ ধরে জয়হীন রিয়ালের পারফরম্যান্স এখন সমর্থকদের মাঝেও তৈরি করেছে নানা প্রশ্ন।
ম্যাচের শুরুটা ছিল বেশ তালমিলহীন এবং অনিয়মিত গতি-ছন্দে ভরা। প্রথমার্ধে দুই দলই আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে ব্যস্ত থাকলেও গোলের দেখা মিলেনি। রিয়াল বারবার প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে ঢুকেও শেষ মুহূর্তে ফিনিশিংয়ের অভাবে সুযোগ নষ্ট করে। একইভাবে এলচেও কয়েকটি সুযোগ থেকে গোল পেতে পারত; তবে থিবাউত কোর্তোয়ার অভিজ্ঞতা এবং গোললাইন নিয়ন্ত্রণ তাদের বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মাঠের দুই প্রান্তে গোলরক্ষকদের নৈপুণ্য প্রথমার্ধকে গোলশূন্যই রেখে দেয়।
কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই খেলার গতি বদলে যায়। রিয়াল যখন ম্যাচে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই ৫৩তম মিনিটে এলচে এগিয়ে যায়। সতীর্থের চমৎকার ব্যাকহিল পাস ব্যবহার করে আলেশ ফেবাস রিয়ালের ডিফেন্স ভেদ করে আলতো শটে কোর্তোয়াকে পরাস্ত করেন। এই গোলের পর রিয়ালের খেলোয়াড়দের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দেয়, যার সুযোগ নিতে চেয়েছিল এলচে। দর্শকরা তখন অপেক্ষা করছিলেন রিয়াল কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়।
রিয়াল অবশ্য খেলা ছাড়ার পাত্র নয়। তাদের গতি বাড়ে ম্যাচের শেষ ২০ মিনিটে। ৭৮তম মিনিটে দারুণ সমতাসূচক গোলটি আসে নির্ভরযোগ্য মিডফিল্ডার হুইসেনের পা থেকে। কর্নার থেকে আসা বল ধরে হুইসেন শক্তিশালী শটে বল জালে জড়ালে আবারও নবউদ্যমে মাঠে ফিরে আসে রিয়াল। সমতা ফিরলেও রিয়ালের মনোবল ছিল জয়ের দিকে; তবে এলচে সেই স্বস্তি আর বেশিক্ষণ থাকতে দেয়নি।
৮৪তম মিনিটে পাল্টা আক্রমণে দুর্দান্ত গোল করে আবারও এগিয়ে যায় এলচে। ডি-বক্সের বাইরে থেকে আলভারো রদ্রিগেজের দূরপাল্লার শট এতটাই নিখুঁত ছিল যে কোর্তোয়া কিছুই করার ছিল না। দর্শকসারিতে হতাশার ঢেউ বয়ে যায়, আর বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়ান কোচ জাবি আলোনসো। তিন ম্যাচ ধরে নিষ্প্রভ ও অস্থির পারফরম্যান্সের পর এই গোল রিয়ালের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।
কিন্তু নাটকীয়তার যেন শেষ ছিল না। যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটেই রিয়াল আবারও ম্যাচে সমতা ফেরায়। এমবাপের বুদ্ধিদীপ্ত কাটব্যাক থেকে বল পান বেলিংহাম। তার প্রথম শটটি এলচের গোলরক্ষক ফেরালেও রিবাউন্ডে আবার বল পেয়ে বেলিংহাম আর ভুল করেননি। তার শক্তিশালী শট জালে জড়াতেই সমতায় ফেরে রিয়াল। শেষ মিনিটগুলোতে রিয়াল মরিয়া হয়ে জয়ের চেষ্টা করলেও আর গোল পায়নি।
ম্যাচের পরে দুই দলের কোচের মুখেই ফুটে ওঠে সন্তুষ্টি ও হতাশার মিশ্র প্রতিক্রিয়া। রিয়াল মাদ্রিদের কোচ জাবি আলোনসো বলেন, ফলাফল তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলেও খেলোয়াড়দের মনোভাব ও সংগ্রামের মানসিকতা তাকে আশাবাদী করেছে। তিনি জানান, দল বর্তমানে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গেলেও তারা আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে চান এবং পরবর্তী ম্যাচগুলোর জন্য আরও সংগঠিত হয়ে মাঠে নামবেন।
অন্যদিকে এলচের কোচ মনে করেন, তার দল শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে প্রয়োজনীয় স্থৈর্য ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। মাঠে তাদের পরিকল্পনার বাস্তব প্রয়োগেই এই ড্র এসেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে ম্যাচে বেশ কিছু বিতর্কিত মুহূর্ত ছিল, বিশেষ করে ভিনিসিয়াস জুনিয়রের সঙ্গে এলচের গোলরক্ষক ইনাকি পেনার সংঘর্ষ নিয়ে এলচে শিবিরে ক্ষোভ রয়েছে। তারা মনে করছে, ওই মুহূর্তে রেফারি ও ভিএআর যথাযথ সিদ্ধান্ত নেয়নি।
লা লিগার পয়েন্ট টেবিলে এই ড্র রিয়াল মাদ্রিদকে শীর্ষে রাখলেও তাদের ব্যবধান এখন মাত্র এক পয়েন্ট। ১৩ ম্যাচে ১০ জয়, দুই ড্র ও এক হারে রিয়ালের পয়েন্ট ৩২। দুই নম্বরে থাকা বার্সেলোনার পয়েন্ট ৩১। ফলে তাদের সামান্য ভুলেও যে শীর্ষস্থান হাতছাড়া হতে পারে, সেটি এখন একেবারেই স্পষ্ট। অন্যদিকে ১৬ পয়েন্ট নিয়ে এলচে আছে ১১ নম্বরে, যা তাদের জন্য সন্তোষজনক অবস্থান।
রিয়ালের এই তিন ম্যাচের জয়হীনতায় স্পষ্ট হয়েছে—দলটি এখনও নিজেদের শীর্ষ ফর্মে পৌঁছাতে পারেনি। এমবাপে, বেলিংহাম, ভিনিসিয়াস থেকে শুরু করে মিডফিল্ড ও ডিফেন্স—সব জায়গায়ই লক্ষ্য করা যাচ্ছে অস্থিরতা। পাশাপাশি চোট-আঘাতও দলের গতি কমিয়ে দিচ্ছে। এ অবস্থায় রিয়ালের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের ছন্দ ফিরে পাওয়া এবং ব্যর্থতার এই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠা।
লা লিগার মৌসুম এখনো অনেক বাকি। কিন্তু শীর্ষ দলগুলোর পয়েন্ট ব্যবধান অল্প হওয়ায় প্রতি ম্যাচই হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ। রিয়ালের মতো দল জানে, শুধু শিরোপার লড়াই নয়—সমর্থকদের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক চাপ, ঐতিহ্যের মর্যাদা—সব মিলিয়ে প্রতিটি ম্যাচেই তাদের নিখুঁত হতে হবে। সুতরাং সামনে অপেক্ষা করছে আরও কঠিন লড়াই, যেখানে ভুলের কোনো সুযোগ নেই।