ভূমিকম্প আতঙ্কে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোতে ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩১ বার
ভূমিকম্প আতঙ্কে ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের

প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

পরপর কয়েক দফা ভূমিকম্প এবং তার পরবর্তী আফটারশক দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিশেষত গত শুক্র ও শনিবারের ভয়াবহ কম্পন রাজধানী ঢাকার শিক্ষাঙ্গনকে আরও বেশি নড়বড়ে করে দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং স্কুল—সব ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠা বাড়ছে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক—সবার মনে সমানভাবে অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা জেঁকে বসেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো ভবনগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে বহুদিন ধরেই আলোচনা চলছে। ভূমিকম্পের পর সেই উদ্বেগ পুঞ্জিভূত হয়ে এক ধরনের আতঙ্কে রূপ নিয়েছে। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জরুরি বৈঠকে বসে। বিশেষজ্ঞদের মতামত, প্রকৌশল বিভাগের মূল্যায়ন এবং সিন্ডিকেটের সুপারিশের ভিত্তিতে আগামী ছয় ডিসেম্বর পর্যন্ত সব ধরনের ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদেরকে রবিবার বিকেল পাঁচটার মধ্যে আবাসিক হল খালি করতে বলা হয়। হল খালি রাখার উদ্দেশ্য হচ্ছে ভবনগুলোর কাঠামোগত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং সম্ভাব্য সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় সময় পাওয়া।

ঘোষণা হতেই হলগুলোতে দেখা যায় তড়িঘড়ি করে জিনিসপত্র গোছানোর ব্যস্ততা। কেউ বই-খাতা হাতে, কেউ ল্যাপটপ ব্যাগ কাঁধে, আবার কেউ জরুরি কাপড়চোপড় নিয়ে দ্রুততার সঙ্গে হল ছাড়ছেন। ক্যাম্পাসজুড়ে এক ধরনের অচেনা অস্থিরতা দেখা গেছে। শিক্ষার্থীরা নিরাপদে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করছেন; কেউ রিকশায় উঠছেন, কেউ বাসস্ট্যান্ডের দিকে দৌড়াচ্ছেন। অনেকে জানিয়েছেন, আকস্মিক এ সিদ্ধান্ত তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছে। তবে অনেকে এটিও স্বীকার করেছেন যে ভূমিকম্পের ঝুঁকি মূল্যায়নের জন্য সময় দেওয়া জরুরি।

এদিকে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজও পরিস্থিতি বিবেচনায় ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত করেছে। কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইন ক্লাসের দিকে ঝুঁকছে, যাতে একাডেমিক কার্যক্রম পুরোপুরি ব্যাহত না হয়। তবে অভিভাবকরা প্রশ্ন তুলছেন—অনলাইন শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের শেখার মান কতটা বজায় রাখা সম্ভব? অনেকেই মনে করছেন, অনলাইন ক্লাসের প্রস্তুতি, প্রযুক্তি এবং দক্ষতা সব স্কুল-কলেজে সমান নয়, ফলে শিক্ষাজীবনে নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি হতে পারে।

রাজধানীর প্রখ্যাত কয়েকটি স্কুল, বিশেষ করে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও ভিকারুন নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ইতোমধ্যেই বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেছে। তবে সব প্রতিষ্ঠান একই সিদ্ধান্ত নেয়নি; কেউ কেউ অপেক্ষায় আছে সরকারি নির্দেশনার। এখন পর্যন্ত মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর কিংবা শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সামগ্রিক কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আগেই সতর্কতামূলক নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে—প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, ভবন ফাঁকা রাখা এবং জরুরি মুহূর্তে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি শুধু ভবনের নিরাপত্তা প্রশ্নটিকেই সামনে আনেনি—শিক্ষার্থীদের মানসিক নিরাপত্তাও পরীক্ষা নিচ্ছে। ভূমিকম্পের সময় যারা হল কিংবা শ্রেণিকক্ষে ছিলেন তারা এখনো আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। কেউ বারবার ভবন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন, কেউ অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আফটারশক কখনো কখনো মূল ভূমিকম্পের চেয়েও ক্ষতিকর হতে পারে। আর পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্বল কাঠামো এমন কম্পনে বেশি নড়বড়ে হয়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে। তাই এখনই প্রয়োজন ভবনগুলোর জরুরি নিরাপত্তা মূল্যায়ন, ফাটল বা ক্ষতিগ্রস্ত অংশ শনাক্ত করা এবং দ্রুত মেরামতের পদক্ষেপ নেওয়া।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, হঠাৎ হল খালি করার নির্দেশে তারা পড়াশোনা, গবেষণা, অ্যাসাইনমেন্ট সবকিছুতেই বিপাকে পড়েছেন। আবার কারও মতে, বড় কোনো দুর্ঘটনা এড়াতে প্রশাসনের এ সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী। বিশেষ করে যেসব আবাসিক হল বহু বছর ধরে সংস্কারবিহীন রয়েছে, সেগুলোতে ভূমিকম্পের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, ভবনগুলোর কাঠামোগত অডিট দ্রুত সম্পন্ন করতে তারা প্রকৌশল বিভাগ এবং বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কাজ শুরু করেছে। প্রতিটি ভবনের ঝুঁকি বিশ্লেষণ, নকশা ত্রুটি পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় নকশা সংস্কারের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হচ্ছে। তারা আশা করছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই মূল্যায়ন সম্পন্ন করে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে।

স্কুল ও কলেজগুলোতেও একই ধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন ইঞ্জিনিয়ার ও ভূতাত্ত্বিকরা। তাদের মতে, পুরোনো ভবনগুলোতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, কলাম-বে-জয়েন্ট শক্তিশালীকরণ, ফাটল মেরামত এবং জরুরি নির্গমন পথ প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন। ভবন নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের উদাসীনতা আজকে শিক্ষার্থীদের জীবনে বাস্তব হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তারা মনে করেন।

এমন অস্থির সময়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বড় চাওয়া—একদিকে যেন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, অন্যদিকে যেন তাদের শিক্ষাজীবনও দীর্ঘ সময়ের জন্য অনিশ্চয়তার মুখে না পড়ে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সুষম অনলাইন ব্যবস্থা, বিকল্প পরীক্ষা পদ্ধতি এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা চালু রাখা জরুরি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভবনগুলো নিরাপদ কিনা—এ প্রশ্নের উত্তর যত দ্রুত মিলবে, শিক্ষার্থীদের আতঙ্কও তত দ্রুত দূর হবে। তাই এখন দরকার দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ। ভূমিকম্পের দুঃসহ স্মৃতি ভুলে গিয়ে সুস্থ পরিবেশে শিক্ষার্থীরা আবারও ক্লাসে ফিরবে—এটাই সকলের প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত