প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরাইলি বিমান হামলায় হিজবুল্লাহর শীর্ষ সামরিক কমান্ডার হাইতাম আলি তাবাতাবাই নিহত হয়েছেন—এই তথ্য নিশ্চিত করেছে লেবাননভিত্তিক সংগঠনটি। রোববার সন্ধ্যায় প্রকাশিত হিজবুল্লাহর বিবৃতিতে জানানো হয়, বৈরুতের দক্ষিণ উপকণ্ঠে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণে তাদের গুরুত্বপূর্ণ এই সামরিক কমান্ডার প্রাণ হারান। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীও পরে হামলার সত্যতা স্বীকার করে জানায়, এটি ছিল তাদের পরিকল্পিত টার্গেট অপারেশনগুলোর একটি।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, হামলায় মোট পাঁচজন নিহত হয়েছেন এবং আরও আটাশ জন আহত হন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। নিহতদের তালিকায় হাইতাম আলি তাবাতাবাইয়ের নাম অন্তর্ভুক্ত থাকায় পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের নভেম্বরে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এই প্রথম এত উচ্চপদস্থ হিজবুল্লাহ কমান্ডার ইসরাইলি হামলায় নিহত হলেন। ফলে বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাকে অঞ্চলজুড়ে নতুন করে উত্তেজনার স্রোত তৈরি হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে।
লেবাননের সরকারি বার্তা সংস্থা এনএনএ জানায়, বৈরুতের দক্ষিণাংশের ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকার উপর আকস্মিকভাবে হামলা চালায় ইসরাইলি যুদ্ধবিমান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, একটি নয়তলা আবাসিক ভবনের তৃতীয় এবং চতুর্থ তলায় টার্গেট করে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। মুহূর্তেই ভবনের ভেতরে ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয় এবং উদ্ধারকর্মীদের কয়েক ঘণ্টা ধরে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে হতাহতদের উদ্ধার করতে হয়। ঘটনাস্থলের ভিডিও ও ছবিগুলোতে দেখা গেছে, বিস্ফোরণের তীব্রতায় ভবনের সামনের অংশ পুরোপুরি ধসে পড়েছে এবং কাছাকাছি থাকা গাড়ি, দোকানপাট ও বসতবাড়িগুলোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় দাবি করেছে, এই হামলা সরাসরি তার অনুমোদনেই পরিচালিত হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয় যে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হিজবুল্লাহর রকেট হামলা ও সীমান্তবর্তী এলাকায় উত্তেজনা বাড়ার পর ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই এমন আক্রমণ চালানো হয়েছে। যদিও লেবানন ও আন্তর্জাতিক মহলের অভিযোগ—ইসরাইল প্রায়ই লেবাননের ভেতরে হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে আসছে।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দক্ষিণ লেবাননে উত্তেজনা বিশেষভাবে তীব্র হয়ে উঠেছে। লেবাননের সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় ইসরাইলি সেনাবাহিনী প্রায় প্রতিদিনই আকাশপথে অভিযান পরিচালনা করছে। ইসরাইল বলছে, তারা হিজবুল্লাহর সামরিক স্থাপনা এবং মুজাহিদ সদস্যদের অবস্থান লক্ষ্য করে ‘সুনির্দিষ্ট হামলা’ চালাচ্ছে। অপরদিকে, হিজবুল্লাহর অভিযোগ—ইসরাইল ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক এলাকাকে টার্গেট করছে এবং এর মাধ্যমে তারা লেবাননের ভেতরে অস্থিতিশীলতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
হাইতাম আলি তাবাতাবাই ছিলেন হিজবুল্লাহর অন্যতম কৌশলগত কমান্ডার। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের বিশেষ অপারেশন ইউনিটগুলোর নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং সিরিয়া ও লেবাননের বিভিন্ন সামরিক অভিযান পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তার মৃত্যু হিজবুল্লাহর জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে বলে মনে করছে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, সংগঠনটি সম্ভবত প্রতিশোধমূলক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে—যা পুরো অঞ্চলে উত্তেজনার মাত্রা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
হামলার পর ঘটনার স্থল পরিদর্শনে গিয়ে লেবাননের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন কড়া নিন্দা জানায় এবং দাবি করে, আবাসিক এলাকা টার্গেট করে হামলা চালানো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও যুদ্ধবিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন। এই হামলাকে মানবিক বিপর্যয় হিসেবে আখ্যায়িত করে তারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানায়।
এদিকে বৈরুতজুড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর টহল বাড়ানো হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে জরুরি সেবা জোরদার করা হয়েছে এবং আহতদের চিকিৎসায় অতিরিক্ত মেডিকেল টিম মোতায়েন করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলার নিন্দা জানিয়ে হাজারো পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই এটিকে যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের আরেকটি দৃষ্টান্ত বলে উল্লেখ করেছেন।
এই ঘটনার পর অঞ্চলের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে অস্থিরতার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ বাড়ছে যে, ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে চলমান উত্তেজনা সীমান্ত অতিক্রম করে বৃহৎ আকারের সংঘাতে রূপ নিতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ও জাতিসংঘ ইতোমধ্যেই পক্ষগুলোর প্রতি সংযম প্রদর্শন ও যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, বৈরুতের এই হামলা লেবানন-ইসরাইল সম্পর্কের উত্তাপকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এবং যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যত নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তাবাতাবাইয়ের মৃত্যু এই সংঘর্ষে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে—যা হয়তো পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে।