প্রকাশ: ৯ জুলাই ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
জাতীয় রাজনীতির পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনায় এসেছে জাতীয় পার্টি। সাম্প্রতিক অব্যাহতির বিতর্কের মধ্যেই দলটির তিনজন জ্যেষ্ঠ নেতা আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার এবং মো. মুজিবুল হক চুন্নু একযোগে জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা জাতীয় পার্টি ছাড়ছেন না। একইসঙ্গে তাঁদের সঙ্গে থাকা ১৬ জন প্রেসিডিয়াম সদস্যও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তাঁরা গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দলের জাতীয় কাউন্সিলে অংশ নেবেন এবং সেখানে থেকেই দলের নেতৃত্ব কাঠামোতে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চান।
মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানে রুহুল আমিন হাওলাদারের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান এই তিন জ্যেষ্ঠ নেতা। সেখানে তাঁদের সঙ্গে আরও ছিলেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের চার উপদেষ্টা, দুই যুগ্ম মহাসচিবসহ কেন্দ্রীয় ও শীর্ষ পর্যায়ের ২১ জন নেতা, যা এই সংবাদ সম্মেলনকে বহুমাত্রিক তাৎপর্য দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে জাতীয় পার্টিতে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ নতুন মোড় নিতে পারে এবং অনেকে এটিকে দলটিতে সম্ভাব্য ভাঙনের প্রারম্ভ হিসেবে দেখছেন।
সংবাদ সম্মেলনে সদ্য অব্যাহতি পাওয়া মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু স্পষ্ট ভাষায় বলেন, তাঁরা কেউই দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি এবং তাঁদের অবদানই জাতীয় পার্টির ভিত্তি শক্ত করেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা জাতীয় পার্টি ছাড়ব না, ভাঙতেও দেব না। আমাদের শ্রমেই এই দল দাঁড়িয়েছে। আমরা সবাই মিলে আগামী কাউন্সিলে যাব এবং সেখানেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।’
দল থেকে বেরিয়ে যাওয়া নয়, বরং গঠনতন্ত্রের অসঙ্গতি দূর করে ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠাই তাঁদের মূল লক্ষ্য—এ কথা বারবার উঠে এসেছে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, রুহুল আমিন হাওলাদার ও মুজিবুল হকের বক্তব্যে। তাঁদের অভিযোগ, দলের বর্তমান চেয়ারম্যান জি এম কাদের যে প্রক্রিয়ায় তাঁদের অব্যাহতি দিয়েছেন, সেটি গঠনতন্ত্র ও ন্যায্যতার পরিপন্থী। আনিসুল ইসলাম মাহমুদ অভিযোগ করে বলেন, ‘২৮ জুনের যে প্রেসিডিয়াম সভার কথা বলা হচ্ছে, সেটি গঠনতান্ত্রিকভাবে হয়নি। সেই কোরামবিহীন সভার সিদ্ধান্ত বৈধ নয়। সুতরাং আমরা স্বপদেই আছি।’
তিনি আরও দাবি করেন, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর আগে তাঁকে ‘অ্যাক্টিং চেয়ারম্যান’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল এবং সে পদ থেকে জি এম কাদেরের বর্তমান অবস্থানকে তিনি ‘রাতের অন্ধকারের ষড়যন্ত্র’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এরশাদের মৃত্যুশয্যায় সই আদায়ের মাধ্যমে যে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়েছে, তা কার্যত একটি ‘মিলিটারি ক্যু’র মতো।
সংবাদ সম্মেলনে রুহুল আমিন হাওলাদারও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যাঁদের ঘাম আর শ্রমে পার্টি দাঁড়িয়ে আছে, তাঁদের সদস্যপদ পর্যন্ত বাতিল করে দেওয়া কি কোনো সুস্থ রাজনীতির অংশ হতে পারে? আমরা চাই না দল ভাঙুক। আমরা চাই, নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণে সঠিক প্রক্রিয়ায় কাউন্সিল হোক।’
মুজিবুল হক চুন্নুর কথাতেও উঠে আসে গঠনতন্ত্রের ২০/১(ক) ধারার বিতর্ক। তাঁর দাবি, এ ধারা স্বেচ্ছাচারিতা ও অগণতান্ত্রিক শাসনের পথ সুগম করেছে, যা এরশাদের মৃত্যুর পর আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। তিনি বলেন, ‘কোনো মহাসচিবকে কারণ দর্শানো নোটিশ ছাড়াই কীভাবে অব্যাহতি দেওয়া যায়? পার্টির স্বার্থেই আমরা চাই এই ধারা বাতিল হোক, আর্থিক স্বচ্ছতা ফিরুক এবং নেতৃত্ব হোক সমন্বিত।’
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন দলের রওশন এরশাদ অংশের নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশীদ। তিনি বলেন, ‘জাতীয় পার্টি ছোট হতে হতে আজ ধ্বংসপ্রায়। এরশাদের স্বপ্নের দল এভাবে একক নেতার ইচ্ছায় ছোট হতে পারে না। একা হয়ে কেউ পার্টি চালাতে পারবে না।’
এদিকে নবনিযুক্ত মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নেতাদের বিরুদ্ধে জেলা ও মহানগর কমিটির নেতারা শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ তুলেছেন। তাই তাঁদের অব্যাহতি ‘স্বাভাবিক ও যৌক্তিক’। তিনি আরও জানান, এ সিদ্ধান্ত দলে ভাঙন নয়, বরং একটি নবযাত্রা।
জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীদের একটি বড় অংশই মনে করছেন, এই বিরোধের অবসান একমাত্র সম্ভব জাতীয় কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে। আনিসুল ইসলাম মাহমুদসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা বলছেন, তাঁরা শেষ পর্যন্ত আলোচনার পথেই সমাধান চান। তবে তাঁদের কণ্ঠে যে ক্ষোভ ও অভিমান ফুটে উঠেছে, তা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য নতুন করে ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সবমিলিয়ে জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অনিশ্চয়তার ঘনঘটা আরও ঘনীভূত হচ্ছে। আগামী বৃহস্পতিবার জি এম কাদেরপন্থীরা বনানীতে সংবাদ সম্মেলন করবেন বলে জানা গেছে। সেখানেই দলের ভবিষ্যৎ রূপরেখা ও এই সংকট নিয়ে তাঁদের অবস্থান পরিষ্কার হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এখন পুরো দেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের চোখ জাতীয় পার্টির আসন্ন কাউন্সিলের দিকে—সেখানে আদৌ নতুন কোনো সমঝোতা জন্ম নেয় কি না, সেটিই দেখার বিষয়।








