প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গাজার বিভিন্ন কমিউনিটি কিচেনে যুদ্ধবিরতির ছয় সপ্তাহ পার হওয়া সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় খাদ্য ও রসদ পৌঁছায়নি বলে জানিয়েছেন কর্মরত সদস্যরা। আল-জাওয়ায়দা অঞ্চলসহ অন্যান্য এলাকায় কমিউনিটি কিচেনগুলোতে শুধু সীমিত কিছু উপাদান দিয়ে খাবার তৈরি হচ্ছে। বড় বড় ধাতব হাঁড়িতে রান্না করা হচ্ছে রসুন, টমেটো, মরিচ ও মশলা মিশিয়ে, কিন্তু মাছ, মাংস এবং অন্যান্য প্রোটিন জাতীয় খাবার এখনও সরবরাহ হয়নি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজার দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে দু’টি কিচেন পরিচালনা করছে আমেরিকান নিঅর ইস্ট রিফিউজি এইড। এই কিচেনগুলো প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজারের বেশি মানুষকে গরম খাবার সরবরাহ করে থাকে। সংগঠনটির টিম লিডার সামি মাতার জানান, ‘আগে আমরা দিনে ১৫টি হাঁড়ি ব্যবহার করতাম, এখন তা বাড়িয়ে ১২০টি হাঁড়ি করেছি, যা অন্তত ৩০টি অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত শিবিরের মানুষদের খাবার সরবরাহ করছে। তবে, তবুও কিছু বেসিক উপাদান ছাড়া অনেক খাবারই প্রোটিন ও বৈচিত্র্যহীন হয়ে যাচ্ছে।’
যুদ্ধবিরতির পর কিছু খাবার ঢুকতে শুরু করলেও খাদ্যের বৈচিত্র্য সীমিত। কেবল চাউল, পাস্তা ও ডালকে কেন্দ্র করে খাবার তৈরি করা হচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, শিশু ও পরিবারসহ সাধারণ মানুষ প্রায়শই স্প্যাগেটি, টিনজাত খাবার এবং অন্যান্য সীমিত খাদ্য উপাদানেই দিন কাটাচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের পুষ্টির ঘাটতি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে।
কর্মরতদের অভিযোগ, তাজা শাক-সবজি, মাংস ও মুরগি এখনও মানবিক সাহায্যের জন্য অনুমোদিত নয়। এছাড়াও কমিউনিটি কিচেনে রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় চুলা, বাসনপত্র এবং গ্যাসের ক্যানিস্টারের অভাব রয়েছে। খাদ্যের সীমিত সরবরাহ ও পর্যাপ্ত রান্নার সুযোগ না থাকায়, কিচেনের কার্যক্রম সীমিত হচ্ছে এবং মানবিক সহায়তার প্রভাব কমে যাচ্ছে।
সামি মাতার বলেন, ‘আমরা সীমিত উপাদান দিয়েই যথাসাধ্য চেষ্টা করছি, কিন্তু পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার না থাকায় শিশু ও পরিবারের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে। এছাড়া পানি সরবরাহও অপ্রতুল, যা গাজায় স্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।’
কর্মরতরা আরও জানান, মানবিক সাহায্যকারীরা চেষ্টা করলেও স্থানীয় প্রশাসন এবং সীমানার নিয়ন্ত্রণের কারণে খাদ্য সরবরাহ এখনও বাধাপ্রাপ্ত। গাজা অঞ্চলে সীমিত খাদ্য সরবরাহ, যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ এবং অব্যবস্থাপনার কারণে কমিউনিটি কিচেনগুলোর কার্যক্রম প্রভাবিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, যদি তাত্ক্ষণিকভাবে রসদ পৌঁছানো না হয়, তবে শিশু ও বৃদ্ধসহ অসহায় মানুষদের মধ্যে পুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।
মানবিক সাহায্য সংস্থাগুলোও যুদ্ধবিরতির পর নতুন পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত হলেও, সরবরাহ সীমিত থাকায় কার্যক্রমে যথেষ্ট প্রভাব ফেলতে পারছে না। কমিউনিটি কিচেনগুলোতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের জন্য খাবার প্রস্তুত করা হয়, কিন্তু প্রোটিন ও স্বাস্থ্যসম্মত উপাদান না থাকায় খাবারের পুষ্টিগুণ সীমিত। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, খাবারের এই সীমিততা ও বৈচিত্র্যহীনতার কারণে শিশুদের বিকাশ ও স্বাস্থ্য প্রভাবিত হচ্ছে।
একাধিক প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ‘খাদ্য সংকট ও প্রয়োজনীয় রসদ না থাকায় গাজার কমিউনিটি কিচেনগুলো কার্যক্রম পরিচালনায় সীমিত। আমরা চেষ্টা করছি, তবে কেবল বেসিক উপাদান দিয়ে রান্না করা হচ্ছে, যা পর্যাপ্ত নয়। আমাদের কাছে এখনও পর্যাপ্ত চুলা, গ্যাস ও বাসনপত্র নেই।’
গাজার কমিউনিটি কিচেনের এই সংকট মানবিক সহায়তার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো যুদ্ধবিরতির পর অঞ্চলটির মানুষের জন্য ত্রাণ কার্যক্রম বাড়ানোর চেষ্টা করলেও, রসদ ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা কার্যক্রমকে সীমিত করছে। এছাড়া পানির অভাব ও স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে, যা শিশু ও বয়স্কদের জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।
এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা জানান, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গাজার মানবিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও সক্রিয় হতে হবে। খাদ্য, পুষ্টি, পরিষ্কার পানি এবং রান্নার সরঞ্জামের সরবরাহ বৃদ্ধি করা জরুরি। কমিউনিটি কিচেনগুলোকে পর্যাপ্ত সহায়তা না দিলে মানবিক বিপর্যয় চরম আকার ধারণ করতে পারে।
মানবিক সাহায্য সংস্থা এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ আশা করছে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে কমিউনিটি কিচেনগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
গাজার কমিউনিটি কিচেনের অভিজ্ঞ কর্মীরা বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি, তবে তাজা পুষ্টিকর খাবার, প্রোটিন এবং রান্নার উপকরণ ছাড়া মানুষের চাহিদা মেটানো কঠিন। আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপরই এখন আমাদের নির্ভরশীলতা।’
যুদ্ধবিরতির ছয় সপ্তাহ পার হলেও গাজার মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য চাহিদা পূরণে কমিউনিটি কিচেনের সীমাবদ্ধতা মানবিক সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। পরিস্থিতি যদি অবিলম্বে সমাধান না হয়, তবে শিশু, বৃদ্ধ ও অসহায় মানুষদের মধ্যে পুষ্টি ও স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা বৃদ্ধি পাবে।