সিন্ধু প্রদেশ নিয়ে রাজনাথের মন্তব্যে তীব্র পাকিস্তান প্রতিক্রিয়া

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১৩ বার
সিন্ধু প্রদেশ নিয়ে রাজনাথের মন্তব্যে তীব্র পাকিস্তান প্রতিক্রিয়া

প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

ভারত–পাকিস্তান সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনা, অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগের মধ্যে চলেছে। এর মাঝেই নতুন বিতর্কের জন্ম দিলেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। নিজের বক্তব্যে তিনি বলেন, পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশ কোনো এক দিন ভারতের অংশ হতে পারে। তাঁর এই মন্তব্য ইতিমধ্যে দুই দেশের মধ্যে নতুন কূটনৈতিক উত্তাপ তৈরি করেছে। পাকিস্তান এই মন্তব্যকে ‘উসকানিমূলক’ আখ্যা দিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। শুরু থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠা এই বিবৃতি ভারত–পাকিস্তানের সম্পর্ককে আরও কঠিন এক সংকীর্ণ পথে ঠেলে দিচ্ছে। ফোকাস কি-ফ্রেজ সিন্ধু প্রদেশ নিয়ে রাজনাথের মন্তব্য এখন দুই দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

রাজনাথ সিং গত রোববার দিল্লিতে সিন্ধি সমাজ আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানটিতে তিনি তুলে ধরেন ভারতের সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী এবং বিজেপির বর্ষীয়ান নেতা লালকৃষ্ণ আদভানির লেখা স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্য। আদভানি নিজে সিন্ধির সন্তান। দেশভাগের পর সিন্ধু প্রদেশ পাকিস্তানের অংশ হয়ে যাওয়ায় এর ইতিহাস, বেদনা এবং সামাজিক অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বহুবার লিখেছেন। রাজনাথ আদভানির সেই লেখার একটি অংশ উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, আদভানির প্রজন্মের সিন্ধুরা তাঁদের জন্মভূমি ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া কোনো দিন মেনে নিতে পারেননি।

এমন মন্তব্যের পর রাজনাথ আরও বলেন, সিন্ধু নদ ভারতীয়দের কাছে পবিত্র। ভারতের ঐতিহ্য ও সভ্যতার ধারাবাহিকতায় সিন্ধুর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। তাঁর কথায় উঠে আসে, “সভ্যতার দিক থেকে সিন্ধু প্রদেশ ভারতেরই অংশ।” বক্তব্য এখানেই শেষ হয়নি। তিনি বলেন, সীমান্ত সব সময় একই থাকে না। পরিবর্তন হয়। তাই ভবিষ্যতে সিন্ধু প্রদেশ ফের ভারতের অংশ হয়ে যেতে পারে। রাজনাথের এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পরই তা দেশ-বিদেশে আলোড়ন তৈরি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা বাড়তে থাকে। পাকিস্তানে এই মন্তব্যকে ভারতের ‘সম্প্রসারণবাদী মানসিকতা’ বলে বর্ণনা দেওয়া শুরু হয়।

বিতর্ক আরও বাড়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কড়া প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে। একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তারা জানায়, ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য কেবল ভ্রান্তই নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী। বিবৃতিতে বলা হয়, সিন্ধু প্রদেশ নিয়ে এ ধরনের মন্তব্য আঞ্চলিক শান্তিকে হুমকিতে ফেলে। পাকিস্তানের মতে, রাজনাথের মন্তব্য ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী সম্প্রসারণনীতির প্রতিফলন। তাদের দাবি অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার সীমানা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত। এই বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ করার অধিকার ভারত কারও কাছ থেকেই পায়নি।

এর পাশাপাশি পাকিস্তান ভারতের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে উল্লেখ করে তীব্র সমালোচনা করে। বিবৃতিতে বলা হয়, ভারত আগে তার দেশে বসবাসকারী সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করুক। উত্তর–পূর্ব ভারতের মানুষের অভিযোগ, সংঘাত, প্রান্তিকতা ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের কথাও তারা তুলে ধরে। ভারতীয় রাজনীতিতে বহু আলোচিত এই অঞ্চলকে পাকিস্তান সরাসরি আলোচনায় টেনে আনা এবারই প্রথম। পাকিস্তান ওই অঞ্চলে মানবাধিকার সংকটের অভিযোগ তুলে বলে, ভারত তার নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ।

বিবৃতিতে জম্মু–কাশ্মীর প্রসঙ্গও জোরালোভাবে আসে। পাকিস্তান জানায়, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব অনুযায়ী কাশ্মীর সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত। কাশ্মীরিদের আকাঙ্ক্ষা অনুসারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দাবিও তারা আবার পুনর্ব্যক্ত করে। বিবৃতিতে বলা হয়, পাকিস্তান আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সব বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে। তবে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তারা কোনো আপস করবে না। পাকিস্তানের এই অবস্থান তাদের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও এবারের প্রতিক্রিয়া আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ও তাৎক্ষণিক ছিল।

রাজনাথ সিংয়ের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ভারতের ভেতরেও বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সমর্থকরা তাঁর বক্তব্যকে ‘ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার প্রতিধ্বনি’ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, সিন্ধু ভারতীয় সভ্যতার গোড়াপত্তনের একটি অঞ্চল। তাই ভারতীয় সাংস্কৃতিক মানসে সিন্ধুর গুরুত্ব অসীম। অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বলছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এ ধরনের মন্তব্য অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করে। তারা মনে করে, রাজনৈতিকভাবে অস্থির উপমহাদেশে এমন বক্তব্য আঞ্চলিক সম্পর্ক আরও জটিল করে তোলে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা গেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠনগুলো এ ধরনের মন্তব্যকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছে।

এখন প্রশ্ন উঠছে—কেন এমন সময়ে রাজনাথ সিং সিন্ধু প্রসঙ্গ তুললেন? অনেক বিশ্লেষকের মতে, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদী ভাবনার উত্থান এই ধরনের বক্তব্যকে বাড়তি গুরুত্ব দেয়। সিন্ধি সমাজের প্রতি সহানুভূতি, পাকিস্তানের প্রতি কৌশলগত চাপ এবং অভ্যন্তরীণ সমর্থন—সবই এই বক্তব্যে প্রতিফলিত হতে পারে। তবে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া দেখায় যে, এই মন্তব্য দুই দেশের অবিশ্বাসকে আরও গভীর করতে পারে।

অন্যদিকে পাকিস্তান ভারতের সীমান্ত প্রসঙ্গে যে সমালোচনা তুলেছে তা তাদের দীর্ঘদিনের অবস্থানকে আরও জোরালো করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে অতীতের যুদ্ধ, সীমান্ত উত্তেজনা এবং কাশ্মীরের জটিলতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ কমে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় রাজনাথের মন্তব্য দুই দেশের সম্পর্ককে আরও কঠোর সংঘাতে ঠেলে দিতে পারে—এমন আশঙ্কাও উঠে এসেছে।

ভারত এই বিবৃতির পর সরাসরি কোনো পাল্টা বিবৃতি দেয়নি। তবে ভারতের রাজনৈতিক মহলের আলোচনা বলে, পাকিস্তানের বিবৃতি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও প্রশাসনের বিষয়ে হস্তক্ষেপের মতো। ফলে কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কাশ্মীর প্রসঙ্গ আন্তর্জাতিকভাবে ভারত কোনো ভাবেই আলোচনায় আনতে চায় না। পাকিস্তান যখন এই ইস্যুটি নতুনভাবে তুলছে, তখন ভারত তা অত্যন্ত সতর্কভাবে মোকাবিলা করতে পারে।

সর্বশেষ পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজনাথ সিংয়ের বক্তব্য দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন এক ঢেউ সৃষ্টি করেছে। সিন্ধু প্রদেশ নিয়ে এই মন্তব্য কেবল ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রশ্ন নয়, বরং আঞ্চলিক রাজনীতির বড় একটি পর্ব। দুই দেশের সম্পর্ক এমনিতেই জটিল। তার ওপর এ ধরনের মন্তব্য নতুন উত্তেজনা সৃষ্টির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এসব বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই দেশের উচিত উত্তেজনার বদলে সংলাপের পথ বেছে নেওয়া। তবে বাস্তবতা বলছে, রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে তা খুব সহজ হবে না। দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য সংযত কূটনীতি জরুরি। কিন্তু দুই দেশের সাম্প্রতিক বিবৃতি সেই পথকে আরও কঠিন করে তুলছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত