বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি ও প্রস্তুতি: সচেতনতা এখন সময়ের দাবি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২৩ বার

প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনবার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। এই প্রাকৃতিক ঘটনার প্রভাব শুধু সংক্ষিপ্ত সময়ে আতঙ্ক সৃষ্টিই নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও মানসিক শান্তিও প্রভাবিত করছে। আতঙ্কিত না হয়ে নিরাপদ থাকার জন্য মানুষ বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য আহরণ করছেন, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে গুগল। গুগলে ভূমিকম্প সম্পর্কিত প্রশ্নের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সাধারণ মানুষ জানতে চাইছেন, কোন এলাকা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, ভূমিকম্পের পূর্বাভাস কি সম্ভব এবং কীভাবে নিজেদের সুরক্ষিত রাখা যায়।

বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশকে তিনটি অঞ্চলে ভাগ করেছেন ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কিছু অংশ ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচিত। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগের বেশিরভাগ জেলা বড় মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া ঢাকা বিভাগের টাঙ্গাইল, গাজীপুর, নরসিংদী জেলার কিছু অংশ, পুরো কিশোরগঞ্জ জেলা এবং কুমিল্লা বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা, পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু অঞ্চলও ঝুঁকিতে রয়েছে। মধ্যম ঝুঁকিতে রয়েছে ঢাকা, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ফেনী, নোয়াখালী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নির্দিষ্ট এলাকা এবং চট্টগ্রামের কিছু অংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব বিভাগের সাবেক শিক্ষক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, “বাংলাদেশ দুটি প্রধান টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। পশ্চিমদিকে ভারতীয় প্লেট, পূর্বদিকে বার্মা প্লেট এবং উত্তরে ইউরেশিয়ান প্লেট। নরসিংদীর সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের উৎস এই সংযোগস্থলের সামান্য রিসার্জনের ফল। এই ধরনের লকড সেগমেন্টের ক্ষুদ্র মুক্তি বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হতে পারে।”

তবে ভূমিকম্পের সঠিক পূর্বাভাস এখনও সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ অনুযায়ী, সঠিক পূর্বাভাসের জন্য জানা প্রয়োজন কোথায়, কখন এবং কত বড় ভূমিকম্প হবে, যা এখনও প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব হয়নি। এর বদলে ভূতত্ত্ববিদরা ‘প্রাকৃতিক বিপদ মানচিত্র’ ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করে, যা ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণে সাহায্য করে।

বর্তমান প্রযুক্তি ব্যবহার করে রিয়েল টাইম পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব, তবে তা মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য কার্যকর। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানে ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে এই ধরনের সতর্কবার্তা কার্যকরভাবে ব্যবহার হচ্ছে। গুগল তাদের অ্যান্ড্রয়েড ফোনের এক্সেলারোমিটার ব্যবহার করে কম্পন শনাক্ত করে এবং আর্থকোয়েক অ্যালার্ট সিস্টেমে তথ্য পাঠায়। একই এলাকার অনুরূপ তথ্য যাচাইয়ের পর ব্যবহারকারীদের সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। এই সতর্কবার্তা মানুষকে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া, ট্রেন বা গাড়ির গতি কমানো বা অন্যান্য জরুরি প্রতিক্রিয়া নেওয়ার সুযোগ দেয়।

ভূমিকম্প কেন হয়, তা ব্যাখ্যা করে বিশেষজ্ঞরা বলেন, পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠ বিভিন্ন টেকটনিক প্লেটে বিভক্ত, যা একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা বা ফাটলের মাধ্যমে শক্তি সঞ্চয় করে। যখন সেই শক্তি শিলার ধারণ ক্ষমতা অতিক্রম করে, তখন কম্পন সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন ফল্ট লাইন ভূমিকম্পের সম্ভাব্য উৎস। বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং নরসিংদী অঞ্চলে সক্রিয় ফল্ট লাইন রয়েছে।

ভূমিকম্পের সময় করণীয় বিষয়েও বিশেষজ্ঞরা সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও ইম্পেরিয়াল কলেজের ভূমিকম্পবিদ ড. স্টিফেন হিকস পরামর্শ দিয়েছেন, “ভূমিকম্প প্রবণ এলাকায় একটি জরুরি প্যাক রাখা উচিত, যাতে থাকে পানি, শুকনো খাবার, টর্চ, প্রাথমিক চিকিৎসার কিট এবং গুরুত্বপূর্ণ নথির কপি।”

ভূমিকম্পের সময় “ড্রপ, কভার এবং হোল্ড” নীতি মেনে নিরাপদ স্থানে থাকা অত্যন্ত জরুরি। টেবিল বা ডেস্কের নিচে আশ্রয় নিলে মাথার ওপর পড়া বিপদজনক বস্তু থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। ঝাঁকুনি শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওই স্থানে থাকা সবচেয়ে নিরাপদ। পরবর্তীতে যদি বাইরে বের হতে হয়, খোলা জায়গায় গিয়ে নিরাপদ হওয়া উচিত, কারণ ভবনের কাঠামোও ধসে পড়তে পারে।

গবেষকরা সতর্ক করেছেন, প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, আতঙ্কিত না হয়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করা মানুষের হাতে। জরুরি প্রস্তুতি যেমন নিরাপদ আশ্রয়, প্রস্তুত কিট ও প্রাথমিক চিকিৎসা, তেমনি পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে যোগাযোগের পরিকল্পনা থাকা জরুরি।

গুগলের অ্যান্ড্রয়েড আর্থকোয়েক অ্যালার্ট সিস্টেমের মাধ্যমে প্রায় তিন থেকে চারশো কোটি ফোন ব্যবহারকারীর কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছানো সম্ভব। রেডিও বা অন্যান্য মাধ্যমের তুলনায় এই সিস্টেম দ্রুততম সতর্কবার্তা পাঠাতে সক্ষম, যা জীবন রক্ষা করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সাম্প্রতিক ভূমিকম্প এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বোঝা যায়, মানুষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে নিরাপদ স্থানে দ্রুত সরাতে পারছে। তবে এটি যথেষ্ট নয়, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সচেতনতা, জরুরি প্রস্তুতি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা আবশ্যক।

বাংলাদেশের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো প্রাথমিক প্রস্তুতি গ্রহণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এতে মানুষ আতঙ্কিত না হয়ে কার্যকরভাবে ঝুঁকি মোকাবিলা করতে পারবে এবং জীবন ও সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত