প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
নারায়ণগঞ্জের বন্দরে রাতের আঁধারে এক নির্মাণশ্রমিককে ‘চোর’ সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিহতের নাম মো. পারভেজ (৩২)। আজ সোমবার ভোরে সোনাচড়া এলাকার একটি বাড়ির সামনে থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই ঘটনায় এলাকার মানুষ এবং পরিবার সদস্যরা শোক ও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন।
নিহত পারভেজ নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার সিদ্ধিরগঞ্জের বার্মাস্ট্যান্ড এলাকার প্রয়াত তারা মিয়ার ছেলে। পারভেজ দীর্ঘদিন ধরে বন্দরের ঢাকেশ্বরী এলাকায় ভাড়া বাড়িতে স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ বসবাস করতেন। পারভেজের স্ত্রী খাদিজা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, “আমার স্বামী একজন সাধারণ নির্মাণশ্রমিক। রোববার রাতে এলাকার লোকজন তাঁকে ধরে নিয়ে বিদ্যুতের তার চুরির মিথ্যা অভিযোগে মারধর করেছে। ভোরে আমরা জানতে পারি, পারভেজ মারা গেছেন। আমরা চাই, এই হত্যার সঙ্গে জড়িত সকলকে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হোক এবং সুষ্ঠু বিচার হোক।”
পারভেজের প্রতিবেশীরা জানান, পারভেজ একজন শান্তশিষ্ট এবং পরিশ্রমী মানুষ ছিলেন। তিনি নিয়মিত তাঁর পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করতেন। এলাকার এক ব্যক্তি বলেন, “পারভেজ কখনও কারো সঙ্গে বিবাদে জড়াননি। রাতের এই ঘটনার খবর শুনে আমরা সবাই স্তম্ভিত। কেউই ভাবতে পারিনি যে, এমন নির্মম ঘটনা ঘটতে পারে।”
বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লিয়াকত আলী প্রথম আলোকে জানান, রোববার রাতের দিকে পারভেজকে চোর সন্দেহে আটক করা হয় এবং মারধর করা হয়। “আজ সকালে আহত অবস্থায় পারভেজ মারা যান। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে। মৃতের পরিবারের অভিযোগ তদন্ত করে আমরা প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
ওসি আরও জানান, পারভেজের বিরুদ্ধে পূর্বে মাদক ব্যবসার অভিযোগ ছিল। কিন্তু পারভেজকে চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় আরও গভীরভাবে তদন্ত চলছে। তিনি বলেন, “আমরা এলাকার সব কক্ষে নজরদারি শুরু করেছি এবং দ্রুত অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছি। এ ধরনের ঘটনায় অবহেলা করা হবে না।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সোনাচড়া এলাকা দীর্ঘদিন ধরে অরাজক পরিস্থিতির মুখোমুখি। ছোটখাটো দণ্ডবিধি বা চোর সন্দেহের ভিত্তিতে হামলার ঘটনা ঘটলেও কখনও কেউ প্রাণের বিনিময়ে আক্রান্ত হননি। পারভেজ হত্যার ঘটনা পুরো এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। এলাকার এক তরুণ বলেন, “এলাকার মানুষ রাতে ঘুমাতে ভয় পাচ্ছে। আমরা চাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা যেন দ্রুত ব্যবস্থা নিক।”
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চোর সন্দেহে সাধারণ মানুষকে হেনস্থা বা মারধর করা আন্তর্জাতিক ও দেশের আইন অনুযায়ী কঠোরভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ধরনের পরিস্থিতিতে অবিলম্বে পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত। যে কেউ নিজের হাতে বিচার নিলে, তা আইনের পরিপন্থী এবং হত্যার মতো গুরুতর অপরাধে পরিণত হতে পারে।
পরিবার ও প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, পারভেজের মৃত্যু শুধুমাত্র ব্যক্তিগত পরিবারের জন্য নয়, পুরো এলাকার মানুষকে শোক ও আতঙ্কের মধ্যে ফেলেছে। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে জনগণকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনকে আরও সক্রিয় হতে হবে।
মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে এবং পুলিশ এলাকাজুড়ে তদন্ত অভিযান শুরু করেছে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলি স্থানীয়দের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে, যাতে হত্যার সঙ্গে জড়িত সবাইকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা যায়।
এই ঘটনা একটি গভীর সামাজিক বার্তাও বহন করে। পারভেজের মতো শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের উপর মিথ্যা অভিযোগ থেকে রক্ষা করা প্রয়োজন। এলাকার মানুষদের সঙ্গে পুলিশের সুসংগত যোগাযোগ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিরপেক্ষ তদন্ত এই ধরনের হত্যার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এতে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, সামাজিক নিয়ম এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ও সচেতনতা ছাড়া ক্ষুদ্র অভিযোগ থেকে বড় ধরনের দণ্ডবিধি এবং হত্যার ঘটনা ঘটতে পারে। পারভেজের পরিবার এবং স্থানীয় মানুষদের কাছে এটি একটি ব্যথিত স্মরণ, যেখানে সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।