বিবিসির গাজা কাভারেজে পক্ষপাতই বড় কেলেঙ্কারি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৪ বার
গাজা ইস্যুতে বিবিসির পক্ষপাত বড় বিতর্কে রূপ নিয়েছে

প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২৫ মঙ্গলবার। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিবিসিতে সাম্প্রতিক পদত্যাগের ঘটনা নিয়ে এখনো বিশাল আলোড়ন চলছে ব্রিটেনের গণমাধ্যম অঙ্গনে। সংগঠনের ডিরেক্টর জেনারেল এবং নিউজ বিভাগের প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বক্তৃতা সম্পাদনার ভুলের জেরে। বিভ্রান্তিকর এডিটিংয়ের কারণে যেভাবে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল, তা শেষ পর্যন্ত বিবিসির শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর আঘাত হেনেছে। একটি ভুল, তার পরিণতি এবং শেষে দায় স্বীকার—বিবিসির ভেতরের এই প্রক্রিয়াটি একেবারেই স্বচ্ছ। কিন্তু সত্যিকার সংকট কি এই একটি ভুলেই সীমাবদ্ধ? নাকি এর চেয়েও গভীর কোনো ক্ষত বহুদিন ধরেই গড়ে উঠছিল—যা এখন প্রকাশ্যে বিস্ফোরিত হচ্ছে?

ব্রিটেনের গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প–সম্পর্কিত এডিটিং ভুলটি ছিল তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র একটি ঘটনা; প্রকৃত কেলেঙ্কারি আরও বড় জায়গায়। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধের সময় বিবিসির সংবাদ কাভারেজে যে পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে, সেটাই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বহু বছর ধরে বিবিসির একটি বড় পরিচয় ছিল নিরপেক্ষতা। কিন্তু গত দুই বছরে গাজা যুদ্ধের সময় তাদের রিপোর্টিং ইসরাইলের পক্ষে ঝুঁকে গেছে বলে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। অথচ সেই বড় ভুলটি নিয়ে বিবিসির ভেতরে কোনো জবাবদিহি তৈরি হয়নি; বরং তুলনামূলক ছোট একটি এডিটিং ভুলই তাদের নেতৃত্বকে পতনের দিকে ঠেলে দিলো। এই পরিহাস এখন ব্রিটেনের গণমাধ্যম অঙ্গনে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

গণমাধ্যম পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর মিডিয়া মনিটরিং সাম্প্রতিক সময়ে যে বিস্তৃত গবেষণা চালিয়েছে, তাতে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত বিবিসির ৩৫ হাজারের বেশি সংবাদ আইটেম বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলাফল এসেছে অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গবেষণায় দেখা গেছে, গাজা যুদ্ধ নিয়ে বিবিসির কাভারেজে ইসরাইলের দৃষ্টিভঙ্গিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে ধারাবাহিকভাবে, আর ফিলিস্তিনিদের কণ্ঠস্বরকে তুলনামূলকভাবে প্রায় অবজ্ঞার পর্যায়ে উপেক্ষা করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এই সময়কালে গাজায় ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুর সংখ্যা ৪২ হাজার ছাড়ালেও, তাদের মৃত্যু সংবাদ কখনোই সংবাদ কাভারেজে সেই গুরুত্ব পায়নি। ইসরাইলিদের একটি মৃত্যুর ঘটনার যে পরিমাণ মনোযোগ পাওয়া গেছে, ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুর ঘটনা সেই তুলনায় ৩৩ গুণ কম স্থান পেয়েছে বিবিসির প্রতিবেদনে। এমনকি ‘হত্যা করা হয়েছে’ বা ‘হত্যাযজ্ঞ’ শব্দগুলোর ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পার্থক্য প্রকট; ইসরাইলিদের ঘটনায় এই শব্দ ব্যবহার হয়েছে বহুবার, কিন্তু ফিলিস্তিনিদের ঘটনায় তা অত্যন্ত কম।

এতে আরও দেখা যায়, ইসরাইলি কর্মকর্তা, বিশ্লেষক এবং সূত্রের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে ফিলিস্তিনি পক্ষের তুলনায় ১৮ গুণ বেশি। ফলে সংবাদ কাভারেজে যে ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন ছিল, তা প্রায় পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগকে অনেক ক্ষেত্রে উপস্থাপন করা হয়েছে কেবল পরোক্ষ ভুক্তভোগী হিসেবে—ক্ষুধার্ত, গৃহহীন, আহত বা মৃত্যুপথযাত্রী হিসেবে। তাদের ব্যক্তি পরিচয়, অধিকার, ইতিহাস, স্বাধীন সত্তা বা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট খুব কমই আলোচিত হয়েছে।

গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইসরাইলের দীর্ঘ দখলদারিত্বের প্রসঙ্গ। বিবিসির বিশাল পরিমাণ সংবাদ আইটেমের বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ প্রতিবেদনে দখলদারিত্বের সরাসরি উল্লেখ আছে। একইভাবে ইসরাইলের বর্ণবাদী আচরণের কথা রয়েছে মাত্র ২ শতাংশ প্রতিবেদনে—যদিও আন্তর্জাতিক অনেক মানবাধিকার সংস্থাই প্রকাশ্যে তাদের নীতি ও আচরণকে বর্ণবাদী হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

গণমাধ্যমবিশেষজ্ঞদের মতে, সংবাদ কাভারেজে এই অসমতা কেবল সাংবাদিকতার সীমাবদ্ধতা নয়; বরং এটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রভাব, সম্পাদকীয় ভয়ের সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক চাপে নিরপেক্ষতা হারানোর একটি চিত্র। ব্রিটেনের সংবাদমাধ্যম, বিশেষ করে বিবিসির মতো একটি ঐতিহ্যবাহী গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বব্যাপী বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখার দাবি করে এসেছে। কিন্তু গাজা ইস্যুতে তাদের কাভারেজ সেই বিশ্বাসের ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে—ট্রাম্পের বক্তৃতা সম্পাদনার ভুলের চেয়ে বড় যে ভুল বিবিসি করেছে, সেই ভুলের জবাবদিহি কোথায়? গাজায় শিশু হত্যা, অবরোধ, হাসপাতাল ধ্বংস, দুর্ভিক্ষের মতো মানবাধিকার সংকট যখন পুরো বিশ্বে নজর কেড়েছে, বিবিসির মতো একটি গণমাধ্যম কি সেই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করতে পারে? সাংবাদিকতার নীতিমালায় যেখানে সততা, নিরপেক্ষতা এবং মানবিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে পক্ষপাতদুষ্ট কাভারেজের মাধ্যমে বিবিসি কি সেই নীতির লঙ্ঘন করেনি?

এখন পরিস্থিতি এমন যে, ব্রিটেনের গণমাধ্যম মহল দুই ভাগে বিভক্ত। এক পক্ষ বলছে, বিবিসির শীর্ষ পর্যায় পদত্যাগ করেছে বলে—প্রতিষ্ঠানটি অন্তত ভুল স্বীকার করেছে। অন্য পক্ষের মতে, সত্যিকার ভুলের দায় এখনো স্বীকৃত হয়নি। যে কারণে পক্ষপাত, কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক চাপ থেকে জন্ম নেওয়া সংকট আরও গভীরে গিয়েছে।

গাজা যুদ্ধ ঘিরে যে মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে, তা বিশ্ববাসীকে নাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু পশ্চিমা মূলধারার গণমাধ্যমে—বিশেষ করে বিবিসির মতো প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানে—ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতির ঘাটতি ও কাভারেজে অসমতা প্রশ্ন তুলেছে তাদের নৈতিকতার ওপর। এই পরিস্থিতি কেবল এক দেশের গণমাধ্যমের সংকট নয়; বরং বৈশ্বিক তথ্যপ্রবাহে বেড়ে ওঠা পক্ষপাতেরও প্রতিফলন।

বিবিসির সাম্প্রতিক ঝড় তাই শুধু একজন প্রেসিডেন্টের বক্তৃতা সম্পাদনার ভুল নয়। এটি আসলে বহুদিন ধরে জমে থাকা একটি অসন্তোষের বিস্ফোরণ। নিরপেক্ষতার দাবি নিয়ে যে প্রতিষ্ঠান পৃথিবীতে আলাদা মর্যাদা পায়, সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিশ্বাস এখন প্রশ্নবিদ্ধ। এবং এই প্রশ্নের গভীরে রয়েছে গাজার কান্না, ফিলিস্তিনি শিশুদের মৃত্যু এবং উপেক্ষিত বাস্তবতার ভার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত