প্রকাশ: প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২৫ মঙ্গলবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গাজায় ইসরায়েলি হামলার দুই বছরেরও বেশি সময় পার হওয়ার পর নতুন গবেষণা অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে। জার্মানির খ্যাতনামা ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ডেমোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষকরা তাদের পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণে জানিয়েছেন, গাজায় অন্তত এক লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন। জার্মান সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘জাইট’ সোমবার তাদের প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করেছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের পর থেকে চলা দুই বছরের যুদ্ধের সময় অন্তত ৯৯ হাজার ৯৯৭ থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার ৯১৫ জন মানুষের প্রাণহানি হতে পারে। গবেষণা প্রকল্পের সদস্য ইরেনা চেন জানিয়েছেন, “আমরা কখনোই সঠিক সংখ্যাটি নির্ণয় করতে পারব না। তবে আমরা সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পরিসরের একটি অনুমান করতে চেষ্টা করছি।”
গবেষকরা বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এই হিসাব করেছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যের পাশাপাশি তারা স্বতন্ত্র জরিপ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক তথ্য এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক রিপোর্ট ব্যবহার করেছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যুদ্ধের প্রথম দুই বছরে মৃত্যুর সংখ্যা ৬৭ হাজার ১৭৩ দেখিয়েছে, যা সরকারি হিসাব হিসেবে গণ্য। তবে ‘জাইট’ এবং গবেষকরা বলছেন, এই সংখ্যা কম অনুমান করা হয়েছে কারণ বহু হাসপাতাল ধ্বংস হওয়ায় মৃত্যুর সঠিক তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
যুদ্ধের কারণে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মারা যাওয়া বহু মানুষকে তালিকাভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া হাসপাতালের সাধারণ মৃত্যু সনদে অন্তর্ভুক্ত না হওয়া অনেক মৃত্যুও সরকারি হিসাবের বাইরে রয়েছে। গবেষকরা এসব সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রেখে লিঙ্গ এবং বয়সভিত্তিক বিস্তারিত মৃত্যুহারও বের করেছেন। তাদের হিসাব অনুযায়ী, নিহতদের প্রায় ২৭ শতাংশ শিশু, যারা ১৫ বছরের কম বয়সী, এবং প্রায় ২৪ শতাংশ নারী।
গাজার জনগোষ্ঠীর আয়ুও যুদ্ধের কারণে নাটকীয়ভাবে কমেছে। যুদ্ধের আগে নারীদের গড় আয়ু ছিল ৭৭ বছর, পুরুষদের ৭৪ বছর। গবেষকেরা জানিয়েছেন, যুদ্ধ চলার পর গাজার মানুষের গড় আয়ু ২০২৪ সালে নারীদের ক্ষেত্রে ৪৬ বছর এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে ৩৬ বছরে নেমে আসতে পারে। এই তথ্য যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং জনজীবনের ওপর এর প্রভাব স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।
গাজার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনও যুদ্ধের কারণে ভয়াবহভাবে প্রভাবিত হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং জীবনধারণের প্রয়োজনীয় সুবিধা ঘাটতির শিকার হচ্ছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো কাজ করতে না পারায় আহত ও অসুস্থ মানুষ সঠিক চিকিৎসা পায়নি। এছাড়া খাবার, পানি ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদার অভাবও মানুষকে বিপন্ন করেছে।
গবেষকরা জানিয়েছেন, তাদের এই পরিসংখ্যান শুধু মৃতের সংখ্যা নয়, এটি গাজার মানুষের জীবনের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবও তুলে ধরেছে। শিশু এবং মহিলাদের মধ্যে এই উচ্চ মৃত্যুহার সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও বিশাল। স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা যে গাজার পরিস্থিতি মানবিক সংকটে রয়েছে।
গাজায় চলমান এই যুদ্ধের ফলে নাগরিকদের মানসিক স্বাস্থ্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক পরিবার প্রিয়জন হারিয়েছে, শিশুদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়েছে, এবং সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। গবেষকরা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মানবিক সংস্থাগুলোর হস্তক্ষেপ অপরিহার্য।
তথ্যসূত্র এবং গবেষণার ফলাফলের আলোকে দেখা যাচ্ছে যে, গাজার এই মানবিক সংকট কেবল মৃতের সংখ্যা নয়, বরং বাকি জীবিতদের ওপরেও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলেছে। গাজার স্বাস্থ্য, জীবনধারণ, শিক্ষা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। গবেষকরা আশা করছেন, এই বিশ্লেষণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সক্রিয়ভাবে হস্তক্ষেপ করতে অনুপ্রাণিত করবে।