এপ্রিলেই বেইজিং সফরে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১৭ বার
চীন সফরে যাবেন ট্রাম্প

প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২৫ মঙ্গলবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে সাম্প্রতিক টেলিফোন আলাপকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবারও নতুন আলোচনার জন্ম নিয়েছে। দুই নেতার এই দীর্ঘ ফোনালাপের পর নিশ্চিত হয়েছে, আগামী এপ্রিল মাসেই ট্রাম্প বেইজিং সফর করবেন। বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র–চীন সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে এগোলেও, এই দুই নেতার কথোপকথন নতুন করে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সোমবার অনুষ্ঠিত এই ফোনালাপেই শুধু চীন সফরে সম্মতি জানান ট্রাম্প; তিনি শি জিনপিংকেও আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্র সফরের আমন্ত্রণ জানান। বৈশ্বিক অর্থনীতি, নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর বিশ্বব্যাপী যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, সেই পরিস্থিতিতে দুই নেতার এই যোগাযোগকে বড় একটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বলছে, বাণিজ্য, ইউক্রেন যুদ্ধ, ফেন্টানিল সংকট, রাশিয়ার ভূ-রাজনীতি এবং তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ—এসব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়েই আলোচনার বিস্তৃত ক্ষেত্র তৈরি হয় এই ফোনালাপে।

ট্রাম্প ও শি জিনপিং এক মাস আগেও দক্ষিণ কোরিয়ায় মুখোমুখি বৈঠক করেছিলেন। এর ঠিক পরেই এই ফোনালাপ দুই নেতার দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার গতি কতটা দ্রুত এগোচ্ছে, তার একটি ইঙ্গিত দেয়। ট্রাম্প তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া Truth Social–এ লিখেছেন, “চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত দৃঢ়!” তার এই মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক মহলেও এর প্রভাব পড়েছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র–চীন সম্পর্ক গত কয়েক বছর ধরে বাণিজ্যযুদ্ধ, প্রযুক্তি সংকট, সামরিক উত্তেজনা ও তাইওয়ান ইস্যুতে বহুবার উত্তপ্ত হয়েছে।

চীনের সরকারি বার্তাসংস্থা জানিয়েছে, দুই দেশই সমতা, সম্মান ও পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতে অগ্রগতি বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য উভয় দেশের মধ্যে কূটনৈতিক তাপমাত্রা কমছে—এই ইঙ্গিত দেয়। বাণিজ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়ন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের উভয়ের জন্যই জরুরি, বিশেষ করে যখন বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে পড়েছে। প্রযুক্তি খাত থেকে কৃষিপণ্য রপ্তানি—সবকিছুতেই দুই দেশের বিরোধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি হচ্ছে।

সোমবারের ফোনালাপে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে কথা হয়। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, আলোচনার মূল বিষয় ছিল বাণিজ্য। তিনি বলেন, চীনের পক্ষ থেকে যেসব ইতিবাচক সংকেত পাওয়া যাচ্ছে, তা যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট করেছে। তিনি আরও যোগ করেন, চীনও এই অগ্রগতিকে একইভাবে মূল্যায়ন করছে। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা শুল্কনীতি নিয়ে দ্বন্দ্ব প্রশমন করা গেলে বিশ্ববাজারে নতুন একটি স্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে।

ফোনালাপে ইউক্রেন যুদ্ধও একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় ছিল। রাশিয়ার সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও পশ্চিমা বিশ্বের রাশিয়া-বিরোধী অবস্থানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বহু জটিলতা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ভাবছে, চীন যদি রাশিয়ার ওপর আরও চাপ প্রয়োগ করে, তবে ইউক্রেন যুদ্ধের পরিস্থিতি কিছুটা হলেও পরিবর্তন হতে পারে। তবে চীন বরাবরই দাবি করে আসছে, তারা সংঘাত নয়, শান্তির পথে অগ্রসর হতে চায়।

তাইওয়ান ইস্যুতেও দুই নেতা মতবিনিময় করেছেন। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ট্রাম্পকে বলেন, তাইওয়ানের চীনে প্রত্যাবর্তন যুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিক ব্যবস্থায় চীনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চীন বহুবার স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তাইওয়ানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে কোনোভাবেই স্বীকৃতি দেওয়া হবে না, এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও তাইওয়ানকে একীভূত করতে তারা প্রস্তুত। তবে ট্রাম্প তার পোস্টে তাইওয়ান প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছেন—যা কূটনৈতিক মহলে নতুন ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এই ইস্যুতে এখন আরও সতর্ক কৌশল অবলম্বন করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের আসন্ন চীন সফর দুই দেশের সম্পর্কের নতুন মোড় তৈরি করতে পারে। তার আগের মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র–চীন বাণিজ্যযুদ্ধ কয়েক স্তরে তীব্র হয়েছিল। আবারও ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প যদি চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক বা সামরিক উত্তেজনা প্রশমনে উদ্যোগী হন, তবে তা শুধু এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল নয়, পুরো বৈশ্বিক রাজনীতিতেই প্রভাব ফেলবে।

বিশ্ববাজারে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিটি সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতে দুই দেশের প্রতিযোগিতা এখন আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির অন্যতম মূল কেন্দ্রবিন্দু। যুক্তরাষ্ট্র চীনের ওপর যে প্রযুক্তিগত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তা চীনের সেমিকন্ডাক্টর শিল্প ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। অন্যদিকে চীনও তার স্থানীয় শিল্পকে শক্তিশালী করতে বড় পরিসরে বিনিয়োগ করছে।

চীন সফরে গেলে ট্রাম্প এই বিষয়গুলো ঘিরে নতুন কোনো চুক্তি বা কাঠামো তৈরি করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ফেন্টানিল সংকট নিয়েও তারা গভীর আলোচনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে যে মাদকের সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, তার বেশির ভাগ কেমিক্যাল উপাদান চীন থেকে আসে বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। এই ইস্যুতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে চীনের সহযোগিতা যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।

সব মিলিয়ে দুই নেতার এই ফোনালাপ শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতির ইঙ্গিতই নয়, বরং আগামী বছরে বৈশ্বিক রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনাও তৈরি করছে। এপ্রিলের সফর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে, বিশেষ করে যদি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন পেছনে ফেলে নতুন একটি যুগে প্রবেশ করতে চায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত