ঢাকার বাস রুট নিয়ে টানাপোড়েন, সিদ্ধান্তহীনতায় সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৯ জুলাই, ২০২৫
  • ৭১ বার
ঢাকার বাস রুট নিয়ে টানাপোড়েন, সিদ্ধান্তহীনতায় সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ

প্রকাশ: ০৯ জুলাই’ ২০২৫ । নিজস্ব প্রতিবেদক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ঢাকার সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনায় বর্তমানে গভীর দ্বন্দ্ব ও অস্থিরতা বিরাজ করছে। সড়কে নতুন বাস রুট অনুমোদনের প্রক্রিয়া ঘিরে ঢাকা মেট্রো যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি (আরটিসি) কার্যত বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে রয়েছেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিনিধিরা, যারা নতুন রুট নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছেন; অন্যদিকে রয়েছেন বাস মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরা, যাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন আরটিসির কিছু প্রভাবশালী সদস্য।

এই বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে নতুন ২২টি রুটে ১৯টি কোম্পানির বাস চালানোর আবেদন। এই আবেদনের মধ্য দিয়ে ঢাকার পরিবহন খাতে নতুন করে বিশৃঙ্খলা ও অনিয়মের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেক আবেদনকৃত রুট ইতোমধ্যে বিদ্যমান রুটগুলোর সঙ্গে ওভারল্যাপ করছে। এমনকি বেশ কিছু বাস কোম্পানির ফিটনেস ও রুট পারমিট নেই বলেও আরটিসি সভায় অভিযোগ উঠেছে।

আরটিসির বৈঠকের নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কিছু কোম্পানি ৪০ থেকে ৯৭ কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ রুটে মিনিবাস চালানোর অনুমোদন চেয়েছে। অথচ নগর পরিবহনের জন্য প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২০ কিলোমিটার রুটে বাস পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়ে থাকে। এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তর আপত্তি উঠলেও প্রভাবশালীদের প্রভাবে আপত্তিগুলোকে উপেক্ষা করা হচ্ছে।

আবেদন করা কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউনাইটেড সার্ভিস, ভূঁইয়া এন্টারপ্রাইজ, আজমেরী গ্লোরি, আলিফ এন্টারপ্রাইজ, অভিজাত ট্রান্সপোর্ট, সেফটি পরিবহন, চ্যালেঞ্জার লাইন, ঢাকা চাকা, মাশআল্লাহ এক্সপ্রেসসহ আরও কয়েকটি কোম্পানি। এদের মধ্যে কেউ কেউ শত শত নন-এসি বা এসি বাস সড়কে নামানোর পরিকল্পনা করেছে, যা বর্তমানে চলমান অন্যান্য কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি দ্বন্দ্ব তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে ইউনাইটেড সার্ভিসের প্রস্তাবিত রুটটি ৪৫.৭৭ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা এ-২৭১, এ-২২০ ও এ-২২৫ রুটের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। একইভাবে ভূঁইয়া এন্টারপ্রাইজ শিয়া মসজিদ থেকে পাটুরিয়া পর্যন্ত ৯৭ কিলোমিটার, আজমেরী গ্লোরি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সফিপুর পর্যন্ত ৫৬ কিলোমিটার রুটে বাস চালাতে চাচ্ছে।

ডিটিসিএ ও বিআরটিএর প্রতিনিধিরা এ ধরনের আবেদনকে ‘অযৌক্তিক ও অকার্যকর’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং বিশেষভাবে মিনিবাসের মাধ্যমে দীর্ঘ রুটে যাত্রীসেবা দেওয়া সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছেন। তাদের মতে, এতে ট্রাফিক ব্যবস্থায় আরও বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে এবং যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়বে।

অন্যদিকে এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণ নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। বিআরটিএ এখনো এসি বাসের জন্য নির্ধারিত ভাড়া ঘোষণা না করায় পরিবহন কোম্পানিগুলো নিজেদের খেয়ালখুশিমতো ভাড়া আদায় করছে। উদাহরণস্বরূপ, গুলিস্তান থেকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার গেট পর্যন্ত নন-এসি বাসের ভাড়া যেখানে ৩০ টাকা, সেখানে এফআর মোটরস বা গ্রিন ঢাকার এসি বাসে ভাড়া আদায় হচ্ছে তিনগুণের বেশি—৯০ টাকা।

ঢাকা চাকা ও মাশআল্লাহ এক্সপ্রেস দুটি প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে ৩৩৫টি এসি বাস নামানোর প্রস্তাব দিয়েছে, যা অনুমোদন পেলে যাত্রীদের খরচ একলাফে কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। আরটিসির এক সভায় প্রস্তাব এসেছে প্রথম দুই কিলোমিটারে ২০ টাকা ও এরপর প্রতি কিলোমিটারে ৫.৫০ টাকা হারে ভাড়া আদায়ের। সেই হিসেবে গুলিস্তান থেকে যমুনা ফিউচার পার্ক পর্যন্ত যাত্রায় খরচ হবে ১০০ টাকারও বেশি।

নতুন বাস রুট নিয়ে আরটিসি সদস্যদের মধ্যে মতবিরোধ ক্রমেই চরমে পৌঁছেছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান অসন্তোষ প্রকাশ করে আরটিসিকে নতুন কোনো রুট পারমিট না দিতে মৌখিক নির্দেশ দিলেও, সেই নির্দেশ বাস্তবে কার্যকর হয়নি। কমিটির সদস্যদের এই দ্বন্দ্ব নিয়ে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক নীলিমা আখতার ও বিআরটিএ চেয়ারম্যান মো. ইয়াছীন নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করলেও প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম নতুন বাস রুটের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেছেন, যাত্রী চাহিদা বৃদ্ধির কারণে নতুন কোম্পানির বাস চালানো হলে যাতায়াত আরও সহজ হবে। তবে এই যুক্তির আড়ালে যে একটি বৃহৎ বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়িত, তা পরিবহন খাত সংশ্লিষ্ট সবাই অনুধাবন করতে পারছেন।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ঢাকার সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় বর্তমানে যে নৈরাজ্য, তা শুধু যাত্রীসাধারণের জন্য নয়, পুরো নগর ব্যবস্থার জন্যই একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব, কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং সিদ্ধান্তহীনতায় একদিকে যেমন নষ্ট হচ্ছে সম্ভাব্য জনসেবা, অন্যদিকে অকার্যকর হয়ে পড়ছে পরিকল্পিত পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার স্বপ্ন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত