প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইসরাইলি নাগরিক আব্রাহাম বিনেনফেল্ডের জীবনযাত্রা গত কয়েক বছরে তীব্রভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ২০২৩ সালে দক্ষিণ ইসরাইলে হামাসের নৃশংস হামলার পর থেকে তিনি নিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কার মুখোমুখি হন। গাজা অঞ্চলের সঙ্কট, আঞ্চলিক উত্তেজনা, এবং নিরাপত্তাহীনতার পরিস্থিতি তাকে ভাবতে বাধ্য করে যে, হয়তো নিজ দেশের মাটিতে নিরাপদভাবে থাকা এখন আর সম্ভব নয়। এই বাস্তবতার মধ্যেই বিনেনফেল্ড শুরু করেন বিদেশে পাড়ি দেওয়ার প্রস্তুতি।
তবে তখনই তার পরিকল্পনায় এক বিরতি আসে। কারণ তার দুই ভাই ইসরাইল সেনাবাহিনীর রিজার্ভ ইউনিটে দায়িত্ব পালন করছেন। পরিবারিক দায়বদ্ধতার কারণে দেশের বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখে তিনি। কিন্তু গাজা যুদ্ধে চলমান সংঘাত, সীমান্তে সাইরেন বাজানো, সন্ত্রাসী হামলা, ইরান থেকে সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং লেবাননের সীমান্তে উত্তেজনার খবর, বিনেনফেল্ডকে পুনরায় দেশের বাইরে যাওয়ার চিন্তায় নিয়ে আসে। তিনি বলেন, “আমার ভাইদের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি, সাইরেন বাজানো এবং প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে থাকা—সবকিছুই আমাকে দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য প্ররোচিত করছে।”
ইসরাইলের বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করছে যে, বিনেনফেল্ড একাকী নন। গাজা যুদ্ধের পর থেকেই দেশত্যাগের প্রবণতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। গত দুই বছরে কয়েক হাজার ইসরাইলি নিজ দেশ ছেড়ে বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশ ও অন্যান্য অঞ্চলে পাড়ি দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার উদ্বেগ নয়, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসুবিধারও প্রতিফলন।
ইসরাইলের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এক কোটি নাগরিকের মধ্যে ৮০ হাজারেরও বেশি ইসরাইলি দেশ ছেড়েছেন। চলতি বছরও একই সংখ্যার দেশত্যাগ আশা করা হচ্ছে। ফলে ইসরাইলের জনসংখ্যা ও কর্মশক্তি সংকটে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও এক নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইসরাইল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের এক সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি চারজনের মধ্যে একজনেরও বেশি ইসরাইলি দেশের বাইরে যাওয়ার কথা ভাবছেন। এপ্রিল মাসে ৭২০ জন ইহুদি এবং ১৮৭ জন আরব নাগরিকের মধ্যে পরিচালিত এই জরিপে উঠে এসেছে, ২৭ শতাংশ মানুষ ইসরাইল ছেড়ে যাওয়ার বিষয়ে ভাবছেন। যদিও তাদের অনেকেই বিশ্বাস করেন, গণহারে দেশত্যাগ রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
জরিপের বিস্তারিত দেখায়, ৩০ শতাংশ আরব এবং ২৬ শতাংশ ইহুদি দেশত্যাগের কথা ভাবছেন। বিশেষত ধর্মনিরপেক্ষ ইহুদিরা ধর্মীয় বিষয় থেকে বেশি উদ্বিগ্ন নন; তারা নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বেশি চিন্তিত। অনেকে মনে করেন, এই কারণগুলোই তাদের বিদেশে পাড়ি দেওয়ার তাগিদ দেয়। জরিপে দেখা গেছে, দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা নিয়েছে এমন ইহুদির মধ্যে ৬৯ শতাংশ এবং আরব নাগরিকদের মধ্যে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশের নির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই, তবুও তারা দেশ ছেড়ে যেতে চাইছেন।
বিশেষভাবে তরুণদের মধ্যে দেশত্যাগের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। ধর্মনিরপেক্ষ ইহুদি তরুণদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই বিদেশে পাড়ি দেওয়ার কথা বলেছেন। যারা উচ্চ বেতনের চাকরিতে নিযুক্ত, তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ দেশত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অর্থাৎ, যারা প্রযুক্তি, চিকিৎসা, ফাইন্যান্স বা আন্তর্জাতিকভাবে চলাচলের সুযোগযুক্ত চাকরিতে কাজ করছেন, তারা নিরাপত্তা এবং সুযোগ সুবিধার কারণে বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
এই দেশত্যাগের প্রভাব শুধু অর্থনীতি ও জনসংখ্যা ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। এতে সামাজিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্যও পরিবর্তিত হচ্ছে। উচ্চ শিক্ষিত এবং বেশি বেতনের চাকরি করা নাগরিকদের দেশের বাইরে চলে যাওয়া, ইসরাইলের নতুন প্রজন্মের দক্ষতা ও নেতৃত্বের ঘাটতি তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার দিক থেকেও এটি উদ্বেগজনক।
বিনেনফেল্ডের মতো নাগরিকরা প্রমাণ করছেন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এখন দেশের নাগরিকদের জন্য সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে। “যদি সরকার আমার নিরাপত্তা ও জীবন রক্ষা করতে সক্ষম হতো, আমি হয়তো দেশত্যাগের সিদ্ধান্ত না নিতাম। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার তাগিদই আমাকে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে,” বলেন তিনি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরাইলি জনগণের মধ্যে এই দেশত্যাগের প্রবণতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। ইউরোপ, আমেরিকা এবং অন্যান্য স্থানে ইসরাইলি অভিবাসীদের উপস্থিতি নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে। পাশাপাশি এটি ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ জনসংখ্যা, অর্থনীতি এবং সামরিক প্রস্তুতিতেও প্রভাব ফেলবে।
এদিকে, সাধারণ মানুষও উদ্বেগ প্রকাশ করছে। তারা মনে করছেন, দেশত্যাগের এই প্রবণতা ভবিষ্যতে ইসরাইলের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে যারা দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন, তারা প্রত্যেকটি সাইরেন, হামলা বা আঞ্চলিক উত্তেজনাকে খুব কাছ থেকে অনুভব করছেন এবং জীবন ও নিরাপত্তার জন্য উদ্বিগ্ন।
এই সমস্ত পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট যে, গাজা যুদ্ধ এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে ইসরাইলি নাগরিকদের মধ্যে দেশত্যাগের প্রবণতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিনেনফেল্ডের মতো অনেকে ইতিমধ্যেই দেশের বাইরে পাড়ি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, আবার অনেকে ভাবছেন কখন এবং কোথায় তারা নিরাপদভাবে বসবাস করতে পারবেন।
এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের অংশ, যা ইসরাইলের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। দেশত্যাগের সিদ্ধান্ত নেওয়া নাগরিকরা নতুন দেশে নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন, যেখানে বর্তমান পরিস্থিতি তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।