যে কারণ গুলুর জন্য হাসিনাকে ফেরত দেবে না ভারত

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪৩ বার
যে কারণ গুলুর জন্য হাসিনাকে ফেরত দেবে না ভারত

প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের ভারতের কাছে পাঠানো নোট ভার্বাল দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তাঁর এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠানো হয়। এই নোট ভার্বালটির মাধ্যমে ঢাকা আশা করেছিল, ভারতের নীতিনির্ধারকরা একটি জোরালো ও দ্রুত পদক্ষেপে এগিয়ে আসবেন এবং দীর্ঘ সময় রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।

২০১৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের সময়ে পুলিশের দমন-পীড়ণে প্রায় ১,৪০০ জনের মৃত্যুর দায়ের ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনাল এই রায় ঘোষণা করে। এর সঙ্গে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের নোট ভার্বাল পাঠানোর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা আশা করেছিল যে ভারত স্বাভাবিক কূটনৈতিক দায়িত্ব অনুযায়ী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাবে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন, এবং দিল্লি দীর্ঘদিন ধরে কোনো সরাসরি প্রতিক্রিয়া দেয়নি।

ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে তারা রায় সম্পর্কে সচেতন, কিন্তু প্রত্যর্পণ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করা হয়নি। বাংলাদেশ সরকারের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও, ভারত এ পর্যন্ত সরাসরি কোনো উত্তর দেয়নি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে পাঠানো প্রথম নোট ভার্বাল কেবলমাত্র গ্রহণের স্বীকারোক্তি পেয়েছিল; দ্বিতীয় অনুরোধও কোনো কার্যকর জবাব পায়নি।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারতের নীতিনির্ধারকরা বর্তমানে কোনো বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে নারাজ। ভারতের গবেষক স্মৃতি এস. পট্টনায়ক বলেন, “বাংলাদেশে বর্তমানে একটি অস্থায়ী ও সীমিত ম্যান্ডেটের সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। দিল্লি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবে কেবল তখন, যখন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে। এ মুহূর্তে জটিল কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভারতের জন্য সংবেদনশীল।”

ভারত ও শেখ হাসিনার পরিবারের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ভারতের সহযোগিতা, ১৯৭৫ সালের পর আশ্রয় প্রদান এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সহযোগিতা দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। এসব কারণে একজন ‘ঘনিষ্ঠ মিত্র’ হিসেবে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানো ভারতের জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়।

২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও ভারতের কাছে এটি সহজ নয়। চুক্তি অনুযায়ী, ‘রাজনৈতিক অপরাধের’ কারণে প্রত্যর্পণ বাতিল করা সম্ভব। যদিও হত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধ সাধারণত এই ধারার আওতায় পড়ে না, তবু শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ করা ভারতের জন্য জটিল কাজ। এছাড়া ভারত বিচার প্রক্রিয়ার ন্যায্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারে, যা প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে। যদি ভারতের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হয়, তবুও পূর্ণ প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ভারতীয় আদালতের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে, যেখানে শেখ হাসিনা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারতের প্রধান লক্ষ্য হলো দেশের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ হলেও, এই সময় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে দিল্লি নীরব কৌশল অবলম্বন করছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি নির্বাচনকে সামনে রেখে ভারতের জন্য প্রত্যেক পদক্ষেপ অত্যন্ত সংবেদনশীল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের আগে ভারতের পক্ষ থেকে কোনো তীব্র পদক্ষেপ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করতে পারে।

এদিকে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়া আন্তর্জাতিক নীতি এবং ন্যায়বিচারের পথে বাধা সৃষ্টি করে। তবে ভারতের কূটনৈতিক নীতিনির্ধারকরা এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণে সুনির্দিষ্ট এবং ধীরগতি অবলম্বন করছেন। তারা একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক হিসাব করে সিদ্ধান্ত নেবেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের ধীরগতি কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ ও সীমান্ত সংক্রান্ত নিরাপত্তা বিষয়ক বিবেচনার সঙ্গে জড়িত। শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানো রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হলেও, ভারতের কাছে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হলো একটি নির্বাচন-সম্মত, স্থিতিশীল সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে পদক্ষেপ নেওয়া।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে এই বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ন্যায়ের পথে বাধা দেবে না এমন কোনো আন্তর্জাতিক সহযোগী নেই। তবে ভারতের অবস্থান থেকে দেখা যাচ্ছে, দিল্লি এই মুহূর্তে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং কোনো তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারতের এই ধীরগতির পন্থা কেবল নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার কৌশল।

অপরদিকে, ভারতীয় রাজনৈতিক মহলে এই বিষয়টি নিয়ে বিরোধিতাও উল্লেখযোগ্য। কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের জন্য এটি একটি ‘সুনির্দিষ্ট নীতিনির্ধারণের’ চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার পাশাপাশি দেশটির নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্বার্থও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। ভারতের কাছে এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়, যেখানে যে কোনো তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপ দুই দেশের সম্পর্ককে জটিল করতে পারে।

শেখ হাসিনার ভারতভ্রমণ এবং সেখানে দীর্ঘ সময়ের অবস্থানও বিষয়টিকে জটিল করেছে। তার দেশে না ফেরার কারণে রাজনৈতিক মহলে ধীরে ধীরে বিভিন্ন প্রভাব সৃষ্টি হচ্ছে। একই সঙ্গে, বাংলাদেশ সরকারের নোট ভার্বাল এবং আনুষ্ঠানিক অনুরোধ ভারতের কাছে একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছে। ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে, এটি কেবল কূটনৈতিক নয়, রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক মূল্যায়নের বিষয়।

এই পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বোঝা যায়, ভারতের নীতি ও পদক্ষেপ কেবল ন্যায়ের এবং আন্তর্জাতিক আইন নয়, বরং দুই দেশের সম্পর্ক, নির্বাচনী প্রেক্ষাপট এবং দেশের স্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নির্বাচনের আগে ভারতের পক্ষ থেকে কোনো বড় পদক্ষেপ না নেওয়াই মূল কৌশল। নির্বাচনের পর যদি একটি স্থিতিশীল ও নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন ভারতের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হবে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি নিখুঁত উদাহরণ। যেখানে কূটনৈতিক দিক, রাজনৈতিক স্বার্থ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের ন্যায্যতা একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। এ জন্য ভারতের পদক্ষেপ ধীর, সতর্ক এবং সীমিত।

পরিশেষে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ হলেও, এই ধরনের সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে ধীর ও সুচিন্তিত কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নোট ভার্বাল পাঠানো হয়েছে, ভারতের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ এখনও নেয়া হয়নি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নির্বাচন ঘনিয়ে এলে এই বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হতে পারে। তবে ভারতের জন্য নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক স্বার্থের দিকেই প্রথমে মনোযোগ দিতে হবে।

শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ভবিষ্যতে কোনো দেশের নাগরিক প্রত্যর্পণ বা আশ্রয় প্রদানের ক্ষেত্রে কৌশলগত ও মানবিক বিবেচনা একসঙ্গে করতে হয়। ভারতের এই নীরব কৌশল সেই উদাহরণ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত