প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হংকংয়ের উত্তরাঞ্চলের তা পো এলাকার ওয়াং ফুক কোর্ট নামের একটি আবাসিক কমপ্লেক্সে ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫ জনে। এতে আহত হয়েছেন আরও অনেকে। আগুনের প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন ৫১ জন, হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে আরও চারজনের। ঘটনায় একজন দমকলকর্মীরও প্রাণহানি ঘটেছে।
বুধবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ৫১ মিনিটে হঠাৎ করে ওয়াং ফুক কমপ্লেক্সের বহুতল ভবনে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে চারপাশের অ্যাপার্টমেন্টে, এবং কমপ্লেক্সের বাসিন্দারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। স্থানীয়রা জানান, ধোঁয়া এবং আগুনের লাল শিখা দেখে তারা নিজেরাই নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বাধ্য হন। কিছু বাসিন্দা রাতে বন্ধু বা আত্মীয়দের বাড়িতে অবস্থান করতেন। ভোরবেলায় যখন তারা নিজেদের বাড়িতে ফিরে আসেন, তখন ধ্বংসযজ্ঞ চোখে পড়ে।
হংকংয়ের ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, আগুন ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের কয়েকটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। উদ্ধারকারী দল কাজ শুরু করলে চারটি ভবন আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে আগুন পুরোপুরি নিভিয়ে দিতে সারাদিন সময় লাগতে পারে বলে জানানো হয়। ওয়াং ফুক কমপ্লেক্সে মোট আটটি ভবন রয়েছে, যার মধ্যে চারটি পুরোপুরি পুড়ে গেছে, এবং তিনটি ভবনে মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে।
দমকল বিভাগের মুখপাত্র বলেন, “আগুন নিয়ন্ত্রণে আসলেও অনেক অ্যাপার্টমেন্ট এখনও ক্ষতিগ্রস্ত। উদ্ধার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের সারা দিন কাজ করতে হবে। প্রাথমিকভাবে আমরা মৃত ও আহতদের তালিকা সংগ্রহ করছি।”
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ভোর থেকেই কমপ্লেক্সের অনেক বাসিন্দা ঘটনাস্থলে জড়ো হতে শুরু করেন। তারা আগুনের ক্ষয়ক্ষতি এবং আশেপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করছেন। ফায়ার সার্ভিসের তৎপরতায় অনেক বাসিন্দা আগুনে প্রাণহানির হাত থেকে বেঁচে যান। তবে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা এত বেশি যে এখনও পুরো কমপ্লেক্সের নিরাপত্তা পুনঃস্থাপন করা যায়নি।
এদিকে, আগুনের কারণ এখনো জানা যায়নি। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের দুই পরিচালক এবং একজন প্রকৌশলীকে এই ঘটনায় সন্দেহজনক কার্যকলাপের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। হংকং পুলিশের একটি শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, “আমরা তদন্ত শুরু করেছি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, নিরাপত্তা অবহেলা বা অব্যবস্থাপনার কারণে আগুনের সম্ভাব্য সূত্রপাত ঘটেছে। তবে সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করতে আরও তদন্ত চলছে।”
এই আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত কমপ্লেক্সে বসবাসকারীদের মধ্যে বিভিন্ন বয়সী মানুষ রয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, আগুনের সময় অনেক মানুষ দ্রুত বের হতে না পারায় আতঙ্কের মধ্যে পড়েছিলেন। শিশু, বৃদ্ধ এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ মানুষদের উদ্ধার করতে দমকল ও পুলিশকে বিশেষ তৎপর হতে হয়েছে।
হংকং প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জরুরি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। নিহতদের পরিবারকে আর্থিক ও মানসিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আহতদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী ও বিভিন্ন এনজিওও ত্রাণ এবং পুনর্বাসনের জন্য কাজ শুরু করেছে।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বহুতল আবাসিক ভবনে আগুনের মতো দুর্ঘটনা একটি সঙ্কটজনক ঘটনা, যা শুধু প্রাণহানি নয়, বরং সামাজিক ও মানসিক ক্ষতির কারণেও হয়ে থাকে। তারা বলেন, “এ ধরনের দুর্ঘটনার পর সমাজে আতঙ্ক, হতাশা এবং নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। স্থানীয় প্রশাসন ও দমকল বিভাগের তৎপরতা মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।”
হংকংয়ে এমন আগুনের ঘটনা নতুন নয়। পূর্বেও এখানে আবাসিক ভবনে আগুনের কারণে উল্লেখযোগ্য প্রাণহানি ঘটেছে। তবে ওয়াং ফুক কমপ্লেক্সের ঘটনা তার তীব্রতা এবং মৃত্যুর সংখ্যা হিসেবে নজিরবিহীন। নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ফায়ার এলার্ম সিস্টেম এবং জরুরি উদ্ধার কার্যক্রমের যথাযথ ব্যবহার কি না হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই ঘটনায় তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা স্থানীয় নির্মাণ কোম্পানির পরিচালক এবং একজন প্রকৌশলী। পুলিশ জানায়, এদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই ঘটনা ভবিষ্যতে নিরাপত্তা বিধি কড়া করার গুরুত্বও সামনে এনেছে।
ওয়াং ফুক কমপ্লেক্সের বাসিন্দারা জানান, আগুনের সময় অনেক মানুষ আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার করছিল। তারা দ্রুত নিরাপদ স্থানে চলে যেতে সক্ষম হননি। শিশু এবং বৃদ্ধদের উদ্ধার করতে দমকলকর্মীরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালান। স্থানীয়রা সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ, সাহায্য এবং পুনর্বাসন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য চাপ সৃষ্টি করছেন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও এ ঘটনার প্রতি দৃষ্টি দিয়েছে। তারা জানিয়েছেন, বহুতল আবাসিক কমপ্লেক্সে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা, তৎপর প্রশাসন এবং দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুতির অভাব এ ধরনের বিপর্যয়ের জন্য দায়ী হতে পারে। বিশ্ববাসী এই ঘটনায় উদ্বিগ্ন এবং হংকং প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ আশা করছে।
এই ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় নিহত ও আহতদের পরিবারগুলো গভীর শোকের মধ্যে রয়েছে। স্থানীয় সম্প্রদায়ের মানুষও এই বিপর্যয়ে চরমভাবে উদ্বিগ্ন। অনেকেই জানিয়েছেন, আগুনের ধোঁয়া এবং শিখা দেখে তারা নিজেদের জীবনহানি আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
পরবর্তী সময়ে হংকং প্রশাসন আরও তদন্তের মাধ্যমে আগুনের প্রকৃত কারণ নির্ধারণের চেষ্টা করবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে এমন ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা, জরুরি পরিকল্পনা এবং জনসচেতনতা নিশ্চিত করা আবশ্যক।