চট্টগ্রামের চার এলাকায় খুন–আতঙ্কে বিপর্যস্ত রাতের জীবন

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৬ বার
চট্টগ্রামের চার এলাকায় খুন–আতঙ্কে বিপর্যস্ত রাতের জীবন

প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রামের বাকলিয়া, বায়েজিদ, রাউজান ও চান্দগাঁও—এই চার এলাকার মানুষ এখন প্রতিদিনই অস্বস্তি ও ভয় নিয়ে দিন পার করছেন। স্থানীয়দের ভাষায়, এলাকা চারটি এখন যেন ‘নো গো জোন’। রাত নামলেই অদৃশ্য এক আতঙ্ক পুরো পরিবেশকে ঘিরে ফেলে। গত দেড় বছরে এসব এলাকায় অন্তত ২২ জন খুন হয়েছেন। মানুষের অভিযোগ, অপরাধীরা রাজনৈতিক আশ্রয় ও প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বছরের পর বছর ধরে নিজেদের শক্ত ঘাঁটি তৈরি করেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

পুলিশের গোয়েন্দা শাখা ও থানা পুলিশের আলাদা তথ্য বলছে, চলতি বছর জুড়ে এসব চার এলাকায় খুনের ঘটনা যেন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে রাউজান। দলীয় আধিপত্য, চাঁদাবাজি ও এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত দেড় বছরে এখানে খুন হয়েছেন অন্তত ১৪ জন। পুলিশের তদন্ত তালিকায় এসেছে আজিজ গ্রুপ, রায়হান গ্রুপ এবং বিএনপি-ঘেঁষা একাধিক বাহিনীর নাম। রাউজান এলাকায় কথিত সাতটি সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম সান্তু। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে, অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে এবং কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।

রাউজান থানার তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত ১৭টি খুন সংঘটিত হয়েছে, যার মধ্যে ১৪টি সরাসরি রাজনৈতিক বিরোধকেন্দ্রিক। সম্প্রতি যুবদলকর্মী আলমগীর আলমের হত্যাকাণ্ড এলাকার উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর আগেই ৭ অক্টোবর হাটহাজারীর মদুনাঘাট এলাকায় বিএনপিকর্মী আবদুল হাকিমকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। জনবহুল এলাকায় এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলেও হামলাকারীরা নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহল অপরাধীদের আইনের আওতায় আসতে সহায়তা করছে না। থানা সূত্র আরও জানিয়েছে, এলাকায় এখনো কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব টার্গেট কিলিংয়ের তালিকায় রয়েছেন, যাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

অন্যদিকে বাকলিয়া ও বায়েজিদ এলাকায় গত এক বছরে সশস্ত্র নেটওয়ার্কের আধিপত্য নিয়ে সংঘর্ষ, প্রতিশোধ আর প্রকাশ্য খুনের ঘটনা নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বাকলিয়ায় তিনটি খুনের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে দুটি ঘটেছে প্রকাশ্য সড়কে। চলতি বছরের ২৯ মার্চ রাতের হামলায় মোটরসাইকেলে আসা সন্ত্রাসীরা প্রাইভেটকারে গুলি চালিয়ে বখতেয়ার হোসেন মানিক ও মো. আব্দুল্লাহকে হত্যা করে। অভিযোগ রয়েছে, এই হামলার নির্দেশ ছিল আলোচিত সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের পক্ষ থেকে, আর অপারেশনে সহযোগিতা করেছে ছোট সাজ্জাদ ও রায়হান আলমের গ্রুপ।

এরপর ২৮ অক্টোবর রাত ২টার দিকে বাকলিয়া এক্সেস রোডে প্রকাশ্যে গোলাগুলিতে নিহত হন ছাত্রদল নেতা মো. সাজ্জাদ। স্থানীয়রা বলেন, দীর্ঘ পাঁচ মিনিট ধরে তীব্র গুলির শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে, কিন্তু কেউই ভয়ে ঘর থেকে বের হননি। এলাকাবাসীর মতে, এমন ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়; বরং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর শক্তি প্রদর্শনের অংশ হিসেবেই এগুলো ঘটছে।

বায়েজিদ এলাকায়ও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তিনটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। পাহাড়সংলগ্ন মহল্লাগুলোতে রাত নামলেই মোটরসাইকেল বহর নিয়ে অস্ত্রধারীদের টহল দেওয়া, ভিডিও ধারণ করা এবং সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া এখন পরিচিত দৃশ্য। এসব ভিডিওতে দেখা যায়, তরুণরা বিদেশি অস্ত্র হাতে প্রকাশ্যেই ক্ষমতা দেখাচ্ছে এবং প্রতিপক্ষকে হুমকি দিচ্ছে। গত ৫ নভেম্বর এখানকার চালিতাতলী এলাকায় বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনি প্রচারের সময় প্রকাশ্যে পিস্তল ঠেকিয়ে নিহত হন সরওয়ার বাবলা। এই ঘটনাও এলাকায় তীব্র আতঙ্ক তৈরি করেছে।

চান্দগাঁওয়ের পরিস্থিতি তুলনামূলক আলাদা হলেও উদ্বেগের মাত্রা কম নয়। গত এক বছরে দুজন হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেও মূল সমস্যা হচ্ছে এখানকার সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর অস্ত্র প্রদর্শন, মাদক কারবার ও প্রকাশ্য সংঘর্ষ। ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর পাঠানিয়াগোদায় একটি স্পোর্টস জোনের উদ্বোধনের সময় সংঘর্ষে নিহত হন জুবায়ের উদ্দিন বাবু। এ বছরের ৬ সেপ্টেম্বর আকিব নামে এক প্রবাসীকে বাসার কাছে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর পরপরই ২১ জুলাই আবারও গোলাগুলির ঘটনায় ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে পুরো এলাকা। শহিদুল ইসলাম ওরফে বুইস্যা গ্রুপ ও ইসমাইল হোসেন ওরফে টেম্পো গ্রুপের মধ্যে এই সংঘর্ষ ঘটে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এসব ঘটনার প্রভাব এখন তাদের রাতের জীবনযাপন পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকেই মানুষ ঘরে ফিরতে তড়িঘড়ি করেন। দোকানপাটে আগেভাগে শাটার নামিয়ে দেওয়া হয়। অভিভাবকেরা সন্তানদের রাতের টিউশন বা খেলাধুলা করতে পাঠাতে সাহস পান না। আগে যেখানে রাত ১১টা বা ১২টা পর্যন্ত মানুষ চলাফেরা করত, এখন রাত ৮টার পরই রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়। আতঙ্কের কারণে অনেকেই জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হন না।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, এসব ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা, রাজনৈতিক আশ্রয় এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ নেটওয়ার্কের সংঘর্ষের কারণে এলাকাগুলো ধীরে ধীরে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। তারা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সন্ত্রাসীদের প্রকাশ্য ভিডিও, লাইভ, হুমকি এবং অস্ত্র প্রদর্শন নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। অনেক সময় হুমকির পরদিনই খুন হওয়ার উদাহরণ আছে, যা অপরাধীদের দুঃসাহসের প্রতিফলন।

চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ জানান, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে গত ৯ মাসে ১১২ অস্ত্রধারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নগরীর ১৯ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ মোট ৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে পার্বত্যাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন কুকি-চীনের সদস্যও আছে। এ সময়ে সাত কোটি টাকার বেশি মাদক জব্দ এবং আড়াই হাজার মামলার আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

অন্যদিকে নগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শওকত আজম জানিয়েছেন, এসব ঘটনার সঙ্গে বিএনপিকে জড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে এবং প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতেই রাজনৈতিক রঙ দেওয়া হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, বিএনপির সঙ্গে এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কোনো সম্পর্ক নেই, বরং অনেক সময় তাদের নাম ব্যবহার করে অপরাধীরা সুবিধা নেয়। তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেপ্তারের আহ্বান জানান।

চট্টগ্রামের এই চার এলাকার সংকট এখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গভীর ছাপ ফেলেছে। রাতের অন্ধকার নামলেই এলাকার রাস্তাঘাট যেন অজানা ভয় ধরে রেখে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। মানুষের আশা, প্রশাসন দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেবে, যাতে স্বাভাবিক জীবন ফিরে আসে এবং এসব অঞ্চল আর মৃত্যুর আতঙ্কে না কাঁপে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত