প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বগুড়ার শাজাহানপুরে অভিনব কায়দায় ইয়াবা পাচারের সময় দুই নারীকে আটক করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। তাদের পায়ের সঙ্গে স্কচটেপে পেঁচিয়ে রাখা ছিল বিপুল পরিমাণ, মোট ২৪০০ পিচ ইয়াবা ট্যাবলেট। এই ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন এবং ডিএনসির কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, আটককৃতরা দীর্ঘদিন ধরে মাদক বহনের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে এবং বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে।
ডিএনসি বগুড়া জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক জিললুর রহমান জানান, অভিযানটি বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে পরিচালনা করা হয়। বগুড়া–ঢাকা মহাসড়কের শাজাহানপুর উপজেলার নয়মাইল এলাকায় উত্তরবঙ্গগামী হানিফ পরিবহনের একটি বাসে এই অভিযান চালানো হয়। অভিযানে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে উপস্থিত ডিএনসির সদস্যরা সন্দেহভাজন দুই নারীকে লক্ষ্য করেন। বাসের সিটে বসে থাকা অবস্থায় তাদের আচরণ সন্দেহজনক মনে হওয়ায় কর্মকর্তারা অবিলম্বে তাদের দেহ তল্লাশি করেন।
তদন্তে দেখা যায়, দুই নারীর পায়ের সঙ্গে স্কচটেপ দিয়ে শক্তভাবে পেঁচানো অবস্থায় ইয়াবার প্যাকেটগুলো লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। উপপরিচালক জিললুর রহমান বলেন, “যদি এমন অভিনব কায়দায় মাদক পাচার করার চেষ্টা সফল হতো, তবে এর পরিমাণ এবং বাজার মূল্য বিবেচনায় দেশের মাদক সমস্যা আরও ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছাত।” এই অভিযানের মাধ্যমে প্রমাণিত হলো, মাদক চক্র এখন কেবল শাস্ত্রের সীমা অতিক্রম করছে না, বরং তাদের কৌশল আরও জটিল এবং সংগঠিত হচ্ছে।
গ্রেপ্তারকৃত দুই নারী হলেন, বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার পাগলা উত্তরপাড়া এলাকার দিপা আক্তার (৩০) এবং খুলনার রূপসা থানার নৈহাটি গ্রামের নুর-নাহার (৪০)। ডিএনসির কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাদের সাথে আরও কারা জড়িত থাকতে পারে এবং তাদের সম্পূর্ণ নেটওয়ার্ক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে এবং মাদক পাচারের বিস্তারিত তথ্য বের করার জন্য তদন্ত চলছে।
এ ধরনের ধ্বংসাত্মক অপরাধ সমাজের জন্য বড় বিপদ সৃষ্টি করে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নারীদের এই ধরনের অপরাধে যুক্ত হওয়া দৃষ্টান্ত সাধারণ জনগণের জন্য উদ্বেগজনক। “মাদক কেবলই ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি সামাজিক অবক্ষয় এবং অপরাধী চক্রের বৃদ্ধির মূল কারণ। এখানে নারী যারা নেতৃত্বদানকারী বা সহযোগী হিসেবে যুক্ত হচ্ছে, তারা সমাজের অন্যান্য সদস্যদের জন্যও ভয়ঙ্কর উদাহরণ তৈরি করছে,” বলছেন একজন সামাজিক বিশ্লেষক।
ডিএনসি বগুড়া জেলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আটককৃতদের বিরুদ্ধে শাজাহানপুর থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মামলায় তাদের আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে বিচার নিশ্চিত করা হবে। উপপরিচালক জিললুর রহমান বলেন, “মাদক পাচার ও বিতরণের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান। যেকোনো কৌশল এবং পদ্ধতি ব্যবহার করলেও আইন প্রয়োগকারীরা তাদের কার্যক্রম আটকাতে সক্ষম।”
এই ঘটনার মাধ্যমে স্থানীয়দের মনে হয়েছে, এখনকার মাদক চক্র কেবল কৌশলগত নয়, বরং মাদক পাচারের ক্ষেত্রে নতুন নতুন কায়দা এবং অপ্রত্যাশিত পদ্ধতি প্রয়োগ করছে। বাসের ভেতরে এমন অভিনব কায়দা ব্যবহার করে মাদক লুকিয়ে রাখার ঘটনা সমাজের জন্য সতর্কবার্তা। এটি বোঝায়, মাদক ব্যবসায়ীরা যে কোনও নিয়মকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের কার্যক্রম চালাতে সচেষ্ট।
স্থানীয়রা মনে করেন, এমন অভিযানের মাধ্যমে সমাজে মাদকবিরোধী বার্তা আরও শক্তিশালী হবে। তারা বলছেন, “মাদক পাচার একটি জাতীয় বিপদ। প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করে স্থানীয় জনগণও এ ধরনের ঘটনা প্রতিহত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”
ডিএনসি কর্মকর্তা জিললুর রহমান আরও জানান, আটককৃতদের বিষয়ে তদন্তের পর তাদের পেছনে থাকা বড় মাদক চক্রের চিহ্ন পাওয়া যেতে পারে। এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদক প্রবাহ এবং চক্রগুলোর সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে। তিনি বলেন, “আমরা নিশ্চিত করছি যে, শুধু আটক করা নয়, বরং পুরো চক্রকে লক্ষ্য করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এই ঘটনায় নাগরিকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। কেউ মনে করছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় মাদকচক্রকে শক্তভাবে দমন করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে কেউ বলছেন, মাদক পাচারকারীরা ক্রমশ নতুন কৌশল অবলম্বন করছে, তাই জনগণকেও সচেতন হতে হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মাদক সমস্যার সমাধান শুধু আইন প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে না, বরং সামাজিক সচেতনতা, শিক্ষা এবং সম্প্রদায়ের সহযোগিতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডিএনসি কর্মকর্তা এবং স্থানীয় প্রশাসনের জন্য এই অভিযান একটি সফল উদাহরণ। এটি দেখিয়েছে যে, সঠিক তথ্য, পরিকল্পনা এবং সঠিক সময়ে অভিযান পরিচালনা করলে মাদক পাচারকারীদের কার্যক্রম ব্যাহত করা সম্ভব। একই সঙ্গে এটি মাদকবিরোধী প্রচেষ্টাকে আরও উৎসাহিত করছে।
উপপরিচালক জিললুর রহমান বলেন, “এ ধরনের অভিযানের মাধ্যমে সমাজে একটি দৃঢ় বার্তা যাবে যে, মাদক পাচারের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। কেউ আইন অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
মাদকবিরোধী এই অভিযান এবং গ্রেপ্তারকৃত নারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া আইনানুগ ব্যবস্থা বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা ও জনস্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে ধরা হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি দেশের নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে এবং মাদক চক্রের কার্যক্রমের জটিলতা ও বিস্তারের প্রকৃতি সম্পর্কে সমাজকে ধারণা দেবে।
বগুড়া জেলা ও ননদ–ভাবীর এই গ্রেপ্তারকাণ্ড সমাজে মাদকবিরোধী বার্তা শক্তিশালী করেছে। এটি প্রমাণ করে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সক্রিয় থাকলে মাদক চক্রের যে কোনও পরিকল্পনা ব্যর্থ করা সম্ভব। নাগরিকদের সচেতনতা, প্রশাসনের তৎপরতা এবং কঠোর আইন প্রয়োগ একসাথে থাকলে মাদক প্রতিরোধ কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।