প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইসরাইলের সামরিক কাঠামোতে দশকের পর দশক এমন সংকট দেখা যায়নি—এমনটাই জানাচ্ছেন দেশটির প্রভাবশালী রিজার্ভ জেনারেল এবং অভিজ্ঞ সামরিক বিশ্লেষক ইতজাক ব্রিক। তাঁর ভাষায়, এটি ‘‘ইসরাইলি সেনাবাহিনীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ জনবল সংকট’’। চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি, টানা সামরিক অভিযান, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নেতৃত্ব সংকট—সব মিলিয়ে ইসরাইলি ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ) এখন অভূতপূর্ব চাপে রয়েছে। বিদেশি সংবাদমাধ্যম, মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়ন এবং সোশ্যাল মিডিয়া–ভিত্তিক বিভিন্ন ডেটা বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
ইতজাক ব্রিক তাঁর সাম্প্রতিক দীর্ঘ মতামতধর্মী নিবন্ধে এবং গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সতর্ক করে বলেছেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হাজার হাজার কর্মকর্তা ও নন-কমিশন্ড অফিসার (এনসিও) দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন অথবা চাকরির মেয়াদ নবায়ন করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। যুদ্ধ-পরিস্থিতিতে যখন বেশি জনবল, বিশেষ করে অভিজ্ঞ অফিসারদের প্রয়োজন—ঠিক তখনই সেনাবাহিনীকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে এক অস্বাভাবিক কর্মী সংকটের। তিনি মনে করেন, দেশের নিরাপত্তা কাঠামোর অভ্যন্তরে বহুবছর ধরে জমে থাকা সংগঠনগত ত্রুটিগুলোই এখন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সামনে এসেছে।
গাজায় টানা দুই বছরের সামরিক অভিযানে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর ভেতরের বাস্তব চিত্রও ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিভিন্ন স্বাধীন গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই দুই বছরে ৯২৩ জন ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ছয় হাজারেরও বেশি। কিন্তু সংখ্যার বাইরেও রয়েছে আরেকটি অদৃশ্য ক্ষত—যা শারীরিক নয়, মানসিক। বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার ইসরাইলি সেনা যুদ্ধ-পরবর্তী মানসিক চাপ বা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারে (পিটিএসডি) ভুগছেন বলে জানা যাচ্ছে। যুদ্ধের সীমাহীন অনিশ্চয়তা, দীর্ঘ সময় ধরে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন জীবন এবং প্রতিদিনের হতাহতের দৃশ্য—সব মিলিয়ে সেনাদের মানসিক সুস্থতা ভেঙে পড়ছে।
ইতজাক ব্রিক অভিযোগ তুলেছেন, প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা ও যুদ্ধের বাস্তব পরিস্থিতি জনগণের সামনে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। তিনি দাবি করেন, অনেক তথ্যই ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন রাখা হয়, যাতে জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না হয় এবং সরকারের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে। তাঁর মতে, স্বচ্ছতা না থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়, কারণ বাস্তবতাকে আড়াল করার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে দেয়।
ইসরাইলি দৈনিক মারিভ–এ প্রকাশিত ব্রিকের নিবন্ধটি এখন আলোচনার কেন্দ্রে। সেখানে তিনি স্পষ্ট করে লিখেছেন, বহু কর্মকর্তা ইতিমধ্যে অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেছেন এবং নতুন করে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া তরুণ সদস্যদের মধ্যে অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে চান না। সামরিক জীবনকে তারা আর দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার হিসেবে দেখছেন না। যুদ্ধের কঠিন বাস্তবতা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থা সংকট এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সবকিছু মিলে সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ব্রিক তাঁর পর্যালোচনায় সেনাবাহিনীর মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের অদক্ষতার কথাও তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, বছরের পর বছর ধরে জনবল ও দক্ষতাবিষয়ক মূল সমস্যাগুলো উপেক্ষা করা হয়েছে। মানবসম্পদ বিভাগ শুধু প্রশাসনিক কাজের দিকে মনোযোগ দিয়েছে, কিন্তু যুদ্ধ-পরিস্থিতির বদলে যাওয়া চাহিদা এবং রণকৌশলের নতুন চাপগুলো সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। সেই অব্যবস্থাপনার ফল এখন এক ভয়াবহ সংকট হিসেবে সামনে এসেছে।
যুদ্ধের মাঠে আরেকটি বড় সমস্যা হলো অস্ত্র ও সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ। জনশক্তির ঘাটতির প্রভাবে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম ধীর হয়ে গেছে। সরঞ্জাম নষ্ট হলে তা দ্রুত মেরামত করার মতো পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল থাকে না, ফলে যুদ্ধ প্রস্তুতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্রিক সতর্ক করে বলেন, এই সংকট যদি চলতেই থাকে, তবে আইডিএফ খুব দ্রুত একটি সম্পূর্ণ কার্যক্ষম বাহিনী হিসেবে টিকে থাকতে পারবে না। তাঁর মতে, ‘‘বর্তমান পরিস্থিতি এমন যে, সেনাবাহিনী তাদের যুদ্ধ-পরিকল্পনা কার্যকরভাবে পরিচালনার সক্ষমতা হারাতে পারে—এটি আর দূরের ঝুঁকি নয়, বরং অনিবার্য বাস্তবতা।’’
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরাইলি সেনাবাহিনী শুধুমাত্র যুদ্ধক্ষেত্রের চাপেই নয়, বরং একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়েও যাচ্ছে। দেশে সরকারের বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলন, ইহুদি সমাজের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদীদের উত্থান এবং বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে বৈষম্য—সব মিলেই সেনাবাহিনীর ভেতরে প্রভাব পড়ছে। অনেক সেনা মনে করছেন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো প্রায়ই সামরিক কৌশলকে বিপন্ন করছে। ফলে মনোবল কমে যাচ্ছে এবং বাহিনীর প্রতি আস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়ছে।
এদিকে গাজার যুদ্ধ এখনও শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। যুদ্ধ-পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে সেনাদের ওপর চাপও দিন দিন বাড়ছে। বহু পরিবারের অভিযোগ, তাদের ছেলে, ভাই কিংবা স্বামীদের বহু মাস ধরে ছুটি দেওয়া হয় না। তারা ঘরে ফিরতে পারছেন না। দীর্ঘ অনিশ্চয়তায় অনেক পরিবার ভেঙে যাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব পরিবারের আর্তনাদ, হতাশা এবং আক্ষেপ এখন সাধারণ মানুষের আলোচনার বিষয়।
ইতজাক ব্রিকের মতো অভিজ্ঞ সামরিক ব্যক্তিত্ব এভাবে প্রকাশ্যে সেনাবাহিনীর সমালোচনা খুব কমই করেন। তাঁর বক্তব্য তাই গুরুত্ব পাচ্ছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইল সরকারের উচিত এই সংকটকে রাজনৈতিক চোখে না দেখে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা। কারণ একটি দেশের নিরাপত্তা বাহিনী যদি মনোবল ও দক্ষতা হারায়, তবে দেশের প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিতে পড়ে যায়।
ইসরাইলের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু একটি সামরিক সংকট নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব, নীতিনির্ধারণ এবং সামাজিক সুস্থতার ওপর গভীর প্রশ্নের উদ্রেক করছে। এখন দেখতে হবে, দেশটির সরকার ও সামরিক নেতৃত্ব কীভাবে এই সংকট মোকাবিলায় এগিয়ে আসে। জনবল পুনর্গঠন, সেনাদের মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করা, যুদ্ধ-নীতিতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা—এসবই এখন ইসরাইলি সেনাবাহিনীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
এই সংকট কত দ্রুত এবং কীভাবে মোকাবিলা করা যাবে, তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সঠিক নেতৃত্ব এবং বিশ্বাসযোগ্য সংস্কারের ওপর। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—ইসরাইলি সেনাবাহিনী এমন এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে তাদের পথচলা ভবিষ্যতের জন্য নতুন এক মোড় তৈরি করতে পারে।