প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
মাদুরোর দেশত্যাগের শর্ত ঘিরে নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, কারণ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জানিয়েছেন—পূর্ণ আইনি ক্ষমা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মামলা বন্ধের নিশ্চয়তা পেলে তিনি দেশ ছাড়তে প্রস্তুত। ওয়াশিংটন–কারাকাস উত্তেজনার মধ্যেই দুই নেতার অল্প সময়ের ফোনালাপে এমন ইঙ্গিত মাদুরো নিজেই দিয়েছেন বলে জানিয়েছে কল সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্র। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পরই লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ওপর সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়ে আসছে। মাদক চোরাচালানের অভিযোগে সামরিক চাপ, সামরিক অভিযান বিস্তারের হুমকি এবং মাদুরোকে জড়িয়ে গড়ে ওঠা কথিত “কার্টেল দে লস সোলস”–কে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণার প্রস্তুতি—এসবই ছিল ওয়াশিংটনের কৌশলগত চাপ প্রয়োগের অংশ। যদিও মাদুরো এসব অভিযোগ বারবার নাকচ করেছেন। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র আসলে ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল ও প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়, আর সে কারণেই শাসন পরিবর্তনের নামে এ চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।
ফোনালাপে মাদুরো শুধু নিজের নয়, বরং তার পরিবারের সম্পূর্ণ আইনি সুরক্ষার নিশ্চয়তাও চান। তিনি ১০০ জনের বেশি ভেনেজুয়েলান কর্মকর্তার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অনুরোধ করেন। আলোচনায় উঠে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব—নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব। অর্থাৎ মাদুরো এমন এক প্রক্রিয়া চেয়েছেন, যাতে তিনি নিরাপদে দেশ ছাড়লেও সরকারের ক্ষমতা তার ঘনিষ্ঠের হাতেই থাকে, এবং তার রাজনৈতিক অবস্থান সম্পূর্ণ ধ্বংস না হয়।
ট্রাম্প মাদুরোর অধিকাংশ শর্ত সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তবে তিনি মাদুরোকে তার পরিবারের সঙ্গে পছন্দের কোনো দেশে চলে যাওয়ার জন্য এক সপ্তাহের নিরাপদ বহির্গমনের সুযোগ দেওয়ার কথা বলেন। এই সময়সীমা শেষ হয় গত শুক্রবার। এরপর ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা করে, যা দুই দেশের সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত করে তোলে। কারাকাসে এ ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে অনেকের কাছে মেসেজ হিসেবে ধরা পড়েছে—ওয়াশিংটন আলোচনার পথ খুলে রাখলেও চাপের মাত্রা কোনোভাবেই কমাচ্ছে না।
যদিও ফোনালাপের খবর প্রকাশের পর মাদুরো জনসম্মুখে ভেনেজুয়েলার জনগণের প্রতি “পরম আনুগত্য” পুনর্ব্যক্ত করেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তিনি বলেন, তিনি দেশত্যাগ বা ক্ষমতা ছাড়ার ব্যাপারে কোনো চিন্তাই করছেন না। কিন্তু মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় যুক্ত কিছু সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। তাদের মতে, মাদুরো রাজনৈতিক বাস্তবতা উপলব্ধি করছেন এবং নিরাপদ প্রস্থানের সম্ভাবনা পুরোপুরি বাদ দেননি তিনি।
সূত্রগুলোর দাবি, মাদুরো প্রশাসন ইতোমধ্যে ট্রাম্পের সঙ্গে আরেক দফা ফোনালাপের অনুরোধ জানিয়েছে। এটি ইঙ্গিত করে যে মাদুরো এখনো আলোচনার পথ খোলা রাখছেন। ক্ষমতার ভারসাম্য দ্রুত বদলে যাওয়ার ঝুঁকি এবং দেশের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট তাকে এক ধরনের কূটনৈতিক সমঝোতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলায় মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্য সংকট এবং জ্বালানি সঙ্কট বহু বছর ধরে জনগণকে বিপর্যস্ত করে রেখেছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিচ্ছিন্নতা এবং নিষেধাজ্ঞার চাপে রাষ্ট্রীয় কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। এসব পরিস্থিতি মাদুরোর অবস্থানকেও নড়বড়ে করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোর এই ‘শর্তপূর্ণ দেশত্যাগের ইঙ্গিত’ আসলে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বাঁচানোর এক কৌশল। আইনি ক্ষমা নিশ্চিত করতে পারলে তিনি নির্বাসনে গিয়েও রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখতে পারবেন, যা লাতিন আমেরিকার কিছু নেতার ক্ষেত্রে আগে দেখা গেছে। একই সঙ্গে তার পরিবার ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও তার বড় চিন্তা। ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় তিনি সেই নিরাপত্তাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরও কঠোর। ওয়াশিংটন বহুদিন ধরে মাদুরোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এবং তাকে ‘অবৈধ শাসক’ হিসেবে উল্লেখ করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোর গ্রেফতারের তথ্যের জন্য ৫০ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে। সরকারের আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে রয়েছে পৃথক পুরস্কার। যদিও এসব অভিযোগ মাদুরো প্রশাসন “রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র” হিসেবে উল্লেখ করে অস্বীকার করেছে।
এখন প্রশ্ন উঠছে—মাদুরোর সম্ভাব্য দেশত্যাগ কি ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক সংকটের সমাধান আনতে পারে? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, এটি একমাত্র সমাধান নয়। কারণ মাদুরোর পরবর্তী নেতৃত্ব নিয়ে ভেনেজুয়েলার ভেতরে গভীর বিভাজন রয়েছে। বিরোধী শিবিরের বহু নেতা বিশ্বাস করেন, কোনো ধরনের সমঝোতায় মাদুরোর সহযোগীরা ক্ষমতায় টিকে গেলে প্রকৃত গণতন্ত্র ফিরে পাওয়া কঠিন হবে। এদিকে মাদুরো সমর্থকরাও মনে করছেন, পশ্চিমা চাপের কাছে নতি স্বীকার করলে দেশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবে।
জনগণের মধ্যে নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং আন্তর্জাতিক চাপ ভেনেজুয়েলাকে এক প্রান্তিক অবস্থায় দাঁড় করিয়েছে। ফলে মাদুরো ও ওয়াশিংটনের এই গোপন আলোচনার ভবিষ্যৎ পুরো দেশের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে। দেশের ভেতরে বিরোধীরা এখনো প্রকাশ্যে কিছু না বললেও তাদের বড় অংশ মনে করছে—মাদুরো যদি কোনো শান্তিপূর্ণ চুক্তির মাধ্যমে দেশ ছাড়েন, তবে তা দীর্ঘ দিনের অচলাবস্থাকে ভাঙতে পারে।
তবে বড় প্রশ্ন হলো—ওয়াশিংটন কি মাদুরোর শর্তগুলো মেনে নিতে প্রস্তুত? বিশেষত যখন তার বিরুদ্ধে মাদক চোরাচালান, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং দুর্নীতির মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে মতবিরোধও রয়েছে। একাংশ কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে চাইছে, অন্য অংশ মনে করছে মাদুরোর শান্তিপূর্ণ দেশত্যাগই হয়তো ভেনেজুয়েলার জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ।
ফোনালাপের পর আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদুরোর বক্তব্য ও অবস্থান স্পষ্টতই পরিবর্তনশীল। চাপের মুখে তিনি আপসের পথ খুঁজছেন। তবে তার রাজনৈতিক কৌশল কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করছে ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর। এদিকে দেশের ভেতর নতুন প্রস্তাব বা আলোচনার আলো কে জ্বালাবে—সেটিও এখনো অনিশ্চিত।
তবে স্পষ্ট যে আন্তর্জাতিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যে দাঁড়িয়ে মাদুরো নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে হিসাব–নিকাশ করছেন। আর সেই হিসাবের কেন্দ্রেই রয়েছে তার শর্ত—আইনি ক্ষমা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং নিরাপদ পথ। এখন সময়ই বলবে এই শর্তগুলো পূরণ হবে কি না, এবং হবে তো কীভাবে।