আলেপ উদ্দিনের বিরুদ্ধে গুম অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে জমা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৫১ বার

প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

আলেপ উদ্দিনের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগসহ পাঁচ জনের নাম উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি অভিযোগপত্র দাখিল করেছে ভয়েস অফ এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ার্ড পারসন (ভয়েড) নামে একটি সংগঠনের দশজন সদস্য। সংগঠনটির দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্নমত তুলে ধরার কারণে বিভিন্ন সময়ে তাদের স্বজনদের জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে আটক রেখে নির্যাতন করা হয়। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে সংগঠনটির পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দাখিল করা হয়।

অভিযোগকারী দলটি জানায়, তারা প্রত্যেকে কোনো না কোনোভাবে জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের আত্মীয় বা প্রত্যক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত। অভিযোগের তালিকায় পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা আলেপ উদ্দিনসহ আরও চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়। অভিযোগ জমা দেওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ভয়েডের সেক্রেটারি আব্দুল কাইয়ুম মিঠু, যিনি নিজেও এই অভিযোগকারীদের একজন।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক পরিবেশে ভিন্নমত প্রকাশ ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সমালোচনা, ধর্মীয় বিষয়ে মন্তব্য, ব্লগারদের সমালোচনা বা ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াকে কেন্দ্র করে বহু তরুণকে পরিচয়হীনভাবে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের কেউ কেউ ফিরে এলেও অনেকেই দীর্ঘ সময় পরিবার-পরিজনের কাছে অনুপস্থিত ছিলেন। ভয়েডের অভিযোগ, এসব ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্য, যারা সরকারি প্রভাবের আড়ালে থেকে গোপন আটক ও নিপীড়নের কাজ করেছেন বলে দাবিদাররা উল্লেখ করেন।

কাইয়ুম তার বক্তব্যে বলেন, “আমাদের দশজনের কেউই জানতাম না আমরা কোথায়, কেন এবং কার হাতে আটক হয়েছি। জোরপূর্বক গুম করে দীর্ঘ সময় আটকে রেখে নানা ধরনের জিজ্ঞাসাবাদ ও মানসিক চাপ দেওয়া হয়। শুধু আমাদের নয়, আমাদের পরিবারকেও বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছিল। আমরা এখন আইনের ওপর আস্থা রেখে বিচার চাইছি।”

অভিযোগকারীদের মতে, গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মোজাম্মেল হোসেন সাইমন নামের এক তরুণ, যাকে পরবর্তীতে অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের মামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করা হয় বলে পরিবার দাবি করে। ঘটনাটি উল্লেখ করে অভিযোগকারীরা বলেন, সাইমনকে দীর্ঘ সময় আটক রেখে তার বাবা-মাকে ভয় দেখানো হয়; ক্রসফায়ারে হত্যার হুমকি দিয়েও তার কাছ থেকে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়া হয়। পরবর্তীতে আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় এবং তিনি এখনও কারাগারে আছেন। সাইমনের পক্ষ থেকে তার ভাই আব্দুল্লাহ হোসেন ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ জমা দেন।

অভিযোগকারীরা জানান, গুমের শিকারদের অধিকাংশই তরুণ ছিলেন, যাদের রাজনৈতিক কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়নি। বরং তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত প্রকাশ, ব্লগিং, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন পোস্টের প্রতিবাদ ইত্যাদি। অভিযোগকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির অংশ ছিল, যা পরবর্তীতে বহু পরিবারকে গভীর মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে ঠেলে দেয়।

অভিযোগ দাখিলের বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কর্মকর্তারা জানান, অভিযোগটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে এবং নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসারে তা পর্যালোচনা করা হবে। ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানায়, অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতা যাচাই, প্রমাণাদি পর্যবেক্ষণ এবং সাক্ষ্য গ্রহণের উপযোগিতা বিবেচনার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, ঘটনাটির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বাহিনী বা পূর্ববর্তী সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ আন্তর্জাতিক আইনে একটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশের আলোচনায় এটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে, বিশেষ করে গত দেড় দশকের বিভিন্ন সময়ে নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলো নিয়মিতভাবে অভিযোগ করে আসায়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানবাধিকার সংগঠনগুলোও বাংলাদেশে গুম ও বেআইনি আটক প্রসঙ্গে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তবে রাষ্ট্রীয় সংস্থার পক্ষ থেকে বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। সরকারের বক্তব্য ছিল, নিখোঁজ হওয়া অনেকেই স্বেচ্ছায় আত্মগোপন করেছেন অথবা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কারণে পালিয়ে আছেন। তবে পরিবারের সদস্যরা এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন।

ভয়েডের সদস্যরা বলেন, তাদের দাবি রাজনৈতিক নয়; বরং তারা ন্যায়বিচার চান। তারা জানান, অভিযোগ দাখিলের মাধ্যমে অন্তত আইনি প্রক্রিয়ায় ঘটনাগুলো তদন্ত হবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা বন্ধে স্পষ্ট বার্তা যাবে। সংগঠনটি আরও জানায়, প্রমাণাদি, চিকিৎসা প্রতিবেদন, সম্ভাব্য সাক্ষ্য এবং আটক অবস্থার বিবরণসহ অতিরিক্ত নথিপত্রও তারা ট্রাইব্যুনালে জমা দিয়েছে।

এদিকে মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী জোরপূর্বক গুমের মামলাগুলো প্রমাণ করা সব সময়ই কঠিন, কারণ এতে সরকারি বা আধা-সরকারি কাঠামোর সম্পৃক্ততা থাকলে প্রমাণ সংগ্রহ জটিল হয়ে পড়ে। তবে মামলা দায়ের হওয়ায় বিষয়টি এখন বিচার প্রক্রিয়ার আওতায় এসেছে। তারা আশা প্রকাশ করেছেন, ট্রাইব্যুনাল নিরপেক্ষভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।

সংগঠনটির সদস্যরা জানান, এই অভিযোগপত্র শুধু অতীতের একটি নির্দিষ্ট সময়ের ঘটনার বিচার নয়; বরং ভবিষ্যতে যেন আর কোনো পরিবার এমন দুঃসহ অভিজ্ঞতার শিকার না হয়, সেটিই তাদের মূল লক্ষ্য। তাদের প্রত্যাশা, এই মামলার মধ্য দিয়ে গুমের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার ওপর জনমত আরও দৃঢ় হবে এবং আইনের শাসন ও মানবাধিকার রক্ষার পথে এটি একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত