প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত হিসেবে পরিচিত ইউক্রেন যুদ্ধে সম্ভাব্য শান্তি আনার লক্ষ্য নিয়ে আজ মঙ্গলবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করতে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার। এই বৈঠককে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ এটি দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সমাধানের জন্য একটি সম্ভাব্য পথ তৈরি করতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার মন্তব্য করেছেন, তিনি ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করতে চান। তাঁর প্রশাসন এই সংঘাতকে ‘রক্তপাত’ এবং ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তবে এর আগে গত আগস্টে আলাস্কায় পুতিনের সঙ্গে একটি শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও তা কোনো স্থায়ী শান্তি আনতে ব্যর্থ হয়েছে।
গত সপ্তাহে ফাঁস হওয়া ২৮ দফার মার্কিন শান্তি প্রস্তাবের খসড়া ইউক্রেনীয় ও ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছিল। খসড়ায় ন্যাটোর বিষয়ে মস্কোর মূল দাবি, ইউক্রেনের এক-পঞ্চমাংশ অঞ্চলের ওপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ এবং ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর ওপর বিধিনিষেধের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইউরোপীয় শক্তিগুলো যুদ্ধ বন্ধে পাল্টা প্রস্তাব দিয়েছে। জেনেভায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউক্রেন জানিয়েছে, তারা একটি ‘হালনাগাদ ও সংশোধিত’ শান্তি প্রস্তাব তৈরি করেছে।
পুতিন বলেছেন, এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নয়, বরং একগুচ্ছ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। তিনি উল্লেখ করেছেন, ভবিষ্যতে এসব প্রস্তাব চুক্তির ভিত্তি হতে পারে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানিয়েছেন, উইটকফের সঙ্গে বৈঠকটি আজ দিনের দ্বিতীয়ার্ধে অনুষ্ঠিত হবে। তবে রাশিয়ার ‘রেড লাইন’ বা যে শর্তগুলো তারা কোনো অবস্থাতেই ছাড়বে না, তা নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
পেসকভের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘উচ্চস্বরের’ কূটনীতি সহায়ক নয়। হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, উইটকফের এই সফরে কুশনারও তাঁর সঙ্গে যোগ দেবেন। পুতিন বারবার বলেছেন, তিনি শান্তি আলোচনায় প্রস্তুত। তবে ইউক্রেন যদি কোনো চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে রাশিয়ার বাহিনী আরও অগ্রসর হবে এবং ইউক্রেনের আরও অধিক অঞ্চল দখল করবে।
ইউক্রেনপন্থী মানচিত্র অনুযায়ী, রাশিয়ার বাহিনী বর্তমানে ইউক্রেনের ১৯ শতাংশের বেশি অঞ্চল বা ১ লাখ ১৫ হাজার ৬০০ বর্গকিলোমিটার নিয়ন্ত্রণ করছে, যা দুই বছর আগের তুলনায় ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষত ২০২৫ সালে রুশ বাহিনী দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয়েছে। রুশ সামরিক কমান্ডাররা সোমবার পুতিনকে জানিয়েছেন, ইউক্রেনের সম্মুখসারির শহর পোক্রোভস্ক ও ভোভচানস্ক দখল করা হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধে ইতিমধ্যেই ১২ লাখের বেশি মানুষ হতাহত হয়েছে। তবে ইউক্রেন বা রাশিয়া কেউই তাদের ক্ষয়ক্ষতির সঠিক সংখ্যা প্রকাশ করে না।
গত মাসের শেষের দিকে ফাঁস হওয়া খসড়া প্রস্তাবের পর থেকে ইউরোপীয় শক্তিগুলো দ্রুত পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। তারা আশঙ্কা করছে, রুশপন্থী কঠোর শান্তিচুক্তি রাশিয়াকে তেল, গ্যাস এবং বিরল খনিজের ক্ষেত্রে মার্কিন বিনিয়োগের পথ খুলে দিতে পারে এবং মস্কোকে জি৮-এ ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে।
রাশিয়ার মূল দাবিগুলোতে রয়েছে—ইউক্রেন কখনো ন্যাটোতে যোগ দিতে পারবে না, ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর ওপর নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ থাকবে, পুরো দনবাসের ওপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ থাকবে, ক্রিমিয়া, দনবাস, জাপোরিঝঝিয়া ও খেরসনের ওপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণকে স্বীকৃতি দিতে হবে, এবং ইউক্রেনে রুশ ভাষাভাষী ও রুশ অর্থোডক্স অনুসারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে ইউক্রেন বলেছে, এসব শর্ত মেনে নেওয়ার অর্থ আত্মসমর্পণ করা এবং ভবিষ্যতে রাশিয়ার যে কোনো হামলার বিরুদ্ধে তারা কিছু করতে পারবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র কিয়েভের জন্য ১০ বছরের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার প্রস্তাবও রেখেছে।
উইটকফ, কুশনার এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত রোববার মিয়ামির শেল বে ক্লাবে ইউক্রেনের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব রুস্তেম উমেরভের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এই বৈঠকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোর ভবিষ্যৎ, সীমান্ত সুরক্ষা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বৈঠক সফল হলে ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য দীর্ঘদিন ধরে প্রতীক্ষিত শান্তি আনার পথে এক নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে। তবে আলোচনার ফলাফল নির্ভর করছে ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে কঠোর সমঝোতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কূটনৈতিক চাপের ওপর।