পশ্চিম তীরে অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের গুলিতে আতঙ্কে ফিলিস্তিন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬৪ বার
পশ্চিম তীরে অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের গুলিতে আতঙ্কে ফিলিস্তিন

প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সামরিক আগ্রাসন দিন দিন আরও ভয়াবহ ও বিস্তৃত রূপ ধারণ করছে। গত কয়েক মাস ধরে অঞ্চলটিতে অভিযানের তীব্রতা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে ভয়, অনিশ্চয়তা ও মানবিক বিপর্যয়। সর্বশেষ তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে তুবাস শহর ও জেনিনের দক্ষিণে কাবাতিয়া এলাকায়, যেখানে মার্কিন নির্মিত ইসরাইলি অ্যাপাচি যুদ্ধ হেলিকপ্টার থেকে ভারী মেশিনগানের গুলিবর্ষণ করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এ ধরনের আক্রমণের ফলে শুধু সামরিক অভিযানই নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনও গভীরভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় সূত্র আনাদোলু এজেন্সিকে জানায়, মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর থেকেই তুবাস শহরজুড়ে একাধিক রাউন্ড গুলির শব্দ শোনা যায়। অ্যাপাচি হেলিকপ্টারগুলো পুরো শহরের ওপর চক্কর দিয়ে ভারী মেশিনগানের বুলেট ছুড়তে থাকে। লক্ষ্যবস্তু ঠিক কোন জায়গা ছিল তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবে বেসামরিক এলাকায় অবস্থানরত মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর না থাকলেও গুলিবর্ষণের মাত্রা দেখে স্থানীয়দের মধ্যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে যে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে পারে।

কাবাতিয়ায়ও একই দৃশ্য দেখা যায়। ফিলিস্তিনি সরকারি সংবাদসংস্থা ওয়াফা স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, আল-জাকারনেহ নামক পাহাড়ি এলাকায় অ্যাপাচি হেলিকপ্টার থেকে ব্যাপক গুলিবর্ষণ করা হয়েছে। যদিও এলাকা জনবসতিহীন, তবুও উন্মুক্ত স্থানে ভারী অস্ত্র ব্যবহার অনেককেই মনে করিয়ে দেয় যে সামরিক অভিযানের কেন্দ্রবিন্দু এখন গোটা পশ্চিম তীর। এমন এক সময় যখন ফিলিস্তিনি জনগণ দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক ধারাই ধরে রাখতে লড়াই করছে, তখন আকাশপথ থেকে এমন হামলা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।

গত এক সপ্তাহ ধরে তুবাস গভর্নরেটে ইসরাইলি বাহিনী টানা অভিযান চালিয়ে আসছে। এসব অভিযানে ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে, ধ্বংস হয়েছে বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কৃষিজমি। আহত হয়েছে কয়েকশ’ মানুষ এবং গ্রেপ্তার করা হয়েছে বহু ফিলিস্তিনিকে। স্থানীয়রা বলছেন, সেনাবাহিনীর প্রবল আক্রমণের কারণে বহু পরিবার রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছে ভগ্নদশা ভবন অথবা আশপাশের পাহাড়ি এলাকায়। একের পর এক সামরিক অভিযান এলাকাটিকে কার্যত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে।

মঙ্গলবার বিকেলে কাবাতিয়ার পৌরসভা জানায়, ইসরাইলি সেনাবাহিনী শহরে অনির্দিষ্টকালের জন্য পূর্ণ কারফিউ জারি করেছে। এর ফলে বয়স্ক, নারী, শিশু—সকলেই ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন। খাদ্য, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় দ্রব্য সংগ্রহেও মারাত্মক বাধার সৃষ্টি হয়েছে। স্কুল, হাসপাতাল ও বাজার বন্ধ থাকায় স্থানীয়দের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। অনেক পরিবার জানিয়েছেন, সামরিক বাহিনী বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালাচ্ছে, দরজা ভেঙে প্রবেশ করছে এবং বাসিন্দাদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি আগ্রাসন শুধু হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাড়িঘর ভাঙচুর, শহর অবরোধ, চেকপয়েন্টে চলাচল নিয়ন্ত্রণ, রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া, বেসামরিক মানুষের গ্রেপ্তার—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই যুদ্ধ-পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। মঙ্গলবার আল-খলিল, রামাল্লাহ, নাবলুস এবং তুবাসসহ বিভিন্ন গভর্নরেটে ফিলিস্তিনিদের চলাচলে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। প্রধান সড়কগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় মানুষ কর্মস্থল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারেনি। শিশুদের বিদ্যালয় কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়।

কেবল ভূ-অভিযান নয়, আকাশ থেকেও নিয়মিত হামলা চলছে। অ্যাপাচি যুদ্ধ হেলিকপ্টারের মতো উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্রের ব্যবহার এ অঞ্চলে নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ের হামলা তা আরও তীব্র এবং ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এসব হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন করছে, কারণ এতে বেসামরিক মানুষের জীবনের ঝুঁকি বাড়ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অক্টোবর ২০২৩ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত শুধুমাত্র দখলকৃত পশ্চিম তীরেই ইসরাইলি সেনাবাহিনীর হামলায় নিহত হয়েছে প্রায় ১,১০০ ফিলিস্তিনি এবং আহত হয়েছে ১০,৭০০ জনেরও বেশি। পাশাপাশি গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২০,৫০০-এর বেশি মানুষকে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, এদের মধ্যে বহু সংখ্যকই নাবালক, শিক্ষার্থী ও বেসামরিক নাগরিক।

এদিকে আন্তর্জাতিক মহলে ইসরাইলি দখলদারিত্ব নিয়ে নতুন করে আলোড়ন তৈরি করে আইসিজে–র এক ঐতিহাসিক মতামত। গত বছরের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ঘোষণা করে যে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদি দখলদারিত্ব আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। আদালত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের সব ইসরাইলি বসতি উচ্ছেদের আহ্বান জানায়। তবে এই রায়ের পরও পশ্চিম তীরে ইসরাইলি আগ্রাসন থেমে নেই—বরং আরও বিস্তৃত হয়েছে।

মাঠে থাকা সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, ইসরাইলের বর্তমান অভিযানের লক্ষ্য শুধু সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নয়; বরং ফিলিস্তিনিদের ওপর সামগ্রিক চাপ বাড়ানো, তাদের জীবনযাত্রা অচল করে দেওয়া এবং অঞ্চলটিকে বসবাসের অযোগ্য করে তোলা। এর ফলে বহু পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে।

বেসামরিক মানুষের ওপর এমন আগ্রাসন আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের শামিল হলেও কার্যত বিশ্বের বড় শক্তিগুলো নিরব পর্যবেক্ষকের ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের মতো মার্কিন নির্মিত অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ফিলিস্তিনিরা বলছেন, এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তা তাদের ওপর নিপীড়নকে আরও বৈধতা দিচ্ছে।

তবে সব ভয়াবহতা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনিরা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন বেঁচে থাকার, দাঁড়িয়ে থাকার, নিজের অধিকার রক্ষা করার। পশ্চিম তীরের মানুষদের কাছে প্রতিটি দিন একটি পরীক্ষার মতো, যেখানে আশাহত না হয়ে তারা আগের মতোই নিজেদের ঘর, শহর ও পরিবার রক্ষার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ইসরাইলি আগ্রাসনের তীব্রতা এতটাই সহিংস সঙ্গে এসেছে যে প্রশ্ন আরও ঘনীভূত হচ্ছে—এই দখলদারিত্ব আর কতদিন স্থায়ী হবে, এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কবে ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়াবে?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত