বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হামলার অভিযোগে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ নেতা গ্রেপ্তার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ২২ বার

প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

চট্টগ্রামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগে সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি প্রদীপ কুমার চৌধুরীকে গ্রেপ্তারের ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট। আন্দোলনকারীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে দায়মুক্তির সংস্কৃতি এমন হামলার পুনরাবৃত্তিকে উৎসাহিত করে এসেছে, আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দাবি করছে, যারা অপরাধে জড়িত হোক না কেন, আইনের চোখে সবাই সমান।

চট্টগ্রাম নগরের রহমতগঞ্জ এলাকা থেকে গতকাল তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কোতোয়ালি থানা পুলিশ জানায়, তাঁর বিরুদ্ধে নিউমার্কেট এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় একাধিক মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তারের পর তাঁকে থানা হেফাজতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং তিন থেকে চারটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর পর আদালতে সোপর্দের প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

জানা গেছে, গ্রেপ্তার প্রদীপ কুমার চৌধুরী সাতকানিয়ার চরতী ইউনিয়নের মৃত সুকেন্দু বিকাশ চৌধুরীর ছেলে। তিনি চট্টগ্রাম নগরের পূর্ব নাসিরাবাদ এলাকায় বসবাস করেন। রাজনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, তিনি সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও চট্টগ্রামের আলোচিত নেতা মহিবুল হাসান চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। ফলে তাঁর গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনীতিতে বিরাট আলোচনার ঝড় উঠেছে। কেউ বলছেন, এটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চাপ মোকাবিলায় দলের অভ্যন্তরীণ কৌশল, কেউ আবার মনে করছেন, আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এই গ্রেপ্তার।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে যে ২০২৪ সালে নিউমার্কেট–তামাকুমন্ডী লেন এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্র–জনতার ওপর হামলায় প্রদীপ কুমার প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেন। নানা ভিডিওফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ এবং বিভিন্ন প্রমাণের ভিত্তিতে গত বছরের নভেম্বরে কোতোয়ালি থানায় এ ঘটনায় মামলা করা হয়। সেই মামলার ভিত্তিতেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানায় পুলিশ।

কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল করিম বলেন, রহমতগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রদীপ কুমার চৌধুরীকে আটক করা হয়। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর তথ্য যাচাই করে আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, হামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত যেই হোক, তাকে আইনের মুখোমুখি হবেই, কারণ অপরাধ রাজনীতির ঊর্ধ্বে।

এদিকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতারা বলছেন, এই গ্রেপ্তার অনেকটা প্রতীকী হলেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলনকারীরা নানা ধরনের হুমকি, ভয়ভীতি এবং হামলার মুখোমুখি হয়েছেন। তারা মনে করেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়ার কারণে বহু হামলাকারীই শাস্তি এড়িয়ে গেছেন। কিন্তু প্রদীপ কুমার চৌধুরীর গ্রেপ্তারের মাধ্যমে অন্তত একটি বার্তা স্পষ্ট হয়েছে—রাজনৈতিক পরিচয়ও আজ আর দায়মুক্তির নিশ্চয়তা নয়।

আন্দোলনকারী ছাত্রদের একজন জানান, হামলার দিন তাঁরা একটি শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করছিলেন। হঠাৎ করে কিছু লোক তাদের ব্যানার ছিঁড়ে ফেলে এবং ধাক্কাধাক্কি শুরু করে। সেই সময় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক শিক্ষার্থী আহত হন। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, যদি আন্দোলনকারীরা তাদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে না পারেন, তাহলে রাষ্ট্রের কোথায় গণতন্ত্র?

মানবাধিকার সংগঠনগুলোও ঘটনাটিকে ঘিরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে দীর্ঘদিন ধরে অনেক অপরাধী শাস্তির বাইরে থেকে গেছে। যদি সত্যিই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাহলে এই ধরনের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি এবং নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি।

কিন্তু অন্যদিকে আওয়ামী লীগের কিছু স্থানীয় নেতা বলছেন, প্রদীপ কুমারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাদের দাবি, বিরোধী পক্ষ আন্দোলনের নামে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল এবং সংঘর্ষের মুহূর্তে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তাদের অভিযোগ, নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের টার্গেট করে এমন গ্রেপ্তারের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

এ ঘটনার রাজনৈতিক প্রভাবও স্পষ্ট। সাতকানিয়া এলাকায় দলের ভেতর ভিন্নমত দেখা যাচ্ছে। কেউ বলছেন, দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সিদ্ধান্তকে সম্মান করা উচিত, আবার কেউ মনে করছেন, অভ্যন্তরীণ চাপ সামলাতে গিয়ে নির্দোষ নেতাদের বলি দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

শহরজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন এবং তার সাথে যুক্ত সহিংসতা। বিশেষ করে তরুণ সমাজ ন্যায়বিচার এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার দাবি তুলছে আরও জোরালোভাবে। তাদের মতে, যে সমাজে প্রত্যেকে সমান মর্যাদা পাবে, সেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে হামলা চালানো বা আন্দোলন দমন করার প্রবণতা গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে প্রদীপ কুমারের গ্রেপ্তারকে ঘিরে। কেউ সমর্থন জানাচ্ছেন আইনের পদক্ষেপকে, কেউ আবার বলছেন এটি রাজনৈতিক প্রতিশোধ। তবে সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, নাগরিক সমাজ আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠার আশা নতুন করে প্রকাশ করছে। তাদের মতে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে তদন্ত স্বচ্ছ হতে হবে, এবং যিনি দোষী প্রমাণিত হবেন তাকেই শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।

সব মিলিয়ে, চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ নেতা গ্রেপ্তারের ঘটনাটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন গ্রেপ্তার নয়, বরং এটি রাজনৈতিক প্রভাব, সামাজিক আন্দোলন, মানবাধিকার এবং আইনের শাসন—সবকিছুকে কেন্দ্র করে বড় আলোচনায় রূপ নিয়েছে। সামনে মামলার অগ্রগতি এবং তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে জনমতের দৃষ্টিভঙ্গি কোনদিকে মোড় নেয়। তবে এই ঘটনা যে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের আলোচনাকে আরও তীব্র করবে, তা নিশ্চিত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত