প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
মাদারীপুরে একটি প্রাইভেট ক্লিনিকের বাথরুমের ভেতর থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় এক নবজাতককে উদ্ধার করা হয়েছে। গুরুতর অবস্থায় শিশুটিকে প্রথমে ক্লিনিক থেকে মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে নবজাতক হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন। শিশুটি কখনো চোখ খুলে তাকাচ্ছে, কখনো নিঃশ্বাস নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে রাখছে। হাসপাতালের আয়া ও নার্সরা নিরলসভাবে তার যত্নে নিয়োজিত রয়েছেন। কেন্দ্রের বাইরে মানুষ ভিড় করছে, কারো চোখে কৌতূহল, কারো চোখে সহানুভূতি।
ঘটনার তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) রাতে মাদারীপুর শহরের লেকের দক্ষিণপাড়ে অবস্থিত বাবু চৌধুরী জেনারেল হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী সাথী বেগম বাথরুম পরিষ্কার করার সময় শিশুটিকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পান। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিষয়টি ক্লিনিক কর্তৃপক্ষকে জানান। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে নবজাতককে উদ্ধার করে জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রথমে তার অবস্থা গুরুতর ছিল, তবে চিকিৎসার ফলে ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে।
নবজাতকের বয়স বর্তমানে প্রায় দুই দিন। হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স রিয়া আক্তার বলেন, “শিশুটি যখন আমাদের কাছে আসে, তখন তার অবস্থা খুবই শোচনীয় ছিল। তবে তাৎক্ষণিক সেবা এবং যত্নের ফলে এখন সে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে। আমাদের কর্মীরাও নিরলসভাবে তার পাশে রয়েছেন।”
বাবু চৌধুরী জেনারেল হাসপাতালের কর্মী স্বর্ণালী খন্দকার জানান, পরিচ্ছন্নতা কর্মী শিশুটিকে দেখতে পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে আমাদের খবর দেন। এরপর শিশুটিকে উদ্ধার করে জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের পক্ষ থেকে নবজাতকের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পোষণ ব্যবস্থা করা হয়েছে।
মাদারীপুর সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব জানিয়েছেন, শিশুটির সুস্থতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, “প্রথমে আমরা চাই শিশুটি সুস্থ হোক। তার পরে, যদি পরিবারের সন্ধান না মেলে, তবেই দত্তক প্রদানের বিষয়টি ভাবা হবে।” জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ বৈদ্যও জানিয়েছেন, শিশুর চিকিৎসা ও পোষকসহ সকল প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা তাৎক্ষণিক হাসপাতালে গিয়ে খোঁজ নিয়েছি এবং শিশুটি বর্তমানে সুস্থ্য রয়েছে। ভবিষ্যতে প্রশাসনের মাধ্যমে কি করা যায়, সেটা চিন্তা করা হবে।”
মাদারীপুর সদর মডেল থানার পুলিশ উপপরিদর্শক ইকবাল হোসেন বলেন, শিশুটির মা-বাবার পরিচয় শনাক্ত করতে ইতিমধ্যেই সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। পরিচয় শনাক্ত হলে শিশুটিকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
ঘটনাটি মাদারীপুর জেলাজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়রা নবজাতকের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করছেন। হাসপাতাল প্রশাসন এবং সামাজিক কর্মীরা নিশ্চিত করছেন, শিশুটিকে যথাযথ পদ্ধতিতে সুস্থ্য করে দত্তক প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ধরনের ঘটনা শুধু একটি স্থানীয় সংবাদ নয়; এটি সমাজের মানবিক মূল্যবোধ ও শিশুদের সুরক্ষা সম্পর্কে সচেতনতার একটি সংকেত। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অনাথ বা পিতা-মাতা হারা শিশুদের জন্য সরকারি এবং বেসরকারি উভয় সংস্থার পাশাপাশি স্থানীয় সমাজসেবীরা সতর্কভাবে কাজ করা জরুরি। শিশুদের নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে রাখার জন্য প্রশাসনিক তৎপরতা অপরিহার্য।
শিশুটির উদ্ধার ও চিকিৎসা প্রসঙ্গে স্থানীয়রা মানবিক বার্তা পাঠাচ্ছেন। অনেকেই শিশুটিকে দত্তক নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, তবে প্রশাসন নিশ্চিত করেছে, সব কার্যক্রম যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হবে। এটি শিশুর অধিকার ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়ার একটি দৃষ্টান্ত।
মাদারীপুরের নবজাতক উদ্ধার ও পরিচয় খোঁজার এই ঘটনা সামাজিক সংহতি ও দায়িত্ববোধের প্রতিফলন। এটি শিক্ষা দেয় যে, সমাজের প্রত্যেক মানুষকে অসহায় ও পিতা-মাতা হারা শিশুদের প্রতি সহমর্মী হতে হবে এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সক্রিয়ভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বর্তমানে শিশুটি হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন এবং ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে। স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজসেবা কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেছেন, শিশুটির পরিচয় চিহ্নিত হলে তার জন্য নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সবমিলিয়ে, মাদারীপুরে নবজাতক উদ্ধার এবং পরিচয় খোঁজার বিষয়টি শুধু একটি মানবিক ঘটনা নয়, এটি সমাজের শিশু কল্যাণ, আইনগত দায়িত্ববোধ এবং স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর তৎপরতার একটি প্রতিফলন।