প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে এক নারী ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্যকে গলাটিপে হত্যা করার ঘটনায় র্যাব যুবদল নেতা আব্দুল আলিমকে গ্রেপ্তার করেছে। নিহত নারী পিয়ারা খাতুন (৪৫) ছিলেন শাহজাদপুর উপজেলার হাবিবুল্লাহ নগর ইউনিয়নের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য এবং অভিযুক্ত যুবদল নেতা আলিমের স্ত্রী। গ্রেপ্তার আলিম এই ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
র্যাব-১২ এর হেডকোয়াটার থেকে বুধবার দুপুরে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার রাতের কোন এক সময় সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানার হরিনচড়া বাজার থেকে আব্দুল আলিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। র্যাব-১২ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দীপংকর ঘোষ জানিয়েছেন, পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের পর আইনানুগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হেফাজতে নিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এক বছর আগে পিয়ারা খাতুন প্রথম স্বামীকে তালাক দিয়ে আব্দুল আলিমের সঙ্গে বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের পর থেকে তাদের মধ্যে পারিবারিক বিরোধ চলছিল। এই পারিবারিক বিবাদের প্রেক্ষাপটে ২৭ নভেম্বর রাতে আব্দুল আলিম গোপনে তার স্ত্রী পিয়ারা খাতুনকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন এবং লাশ ঘরের মধ্যে রেখে পালিয়ে যান। পরদিন দুপুরে পুলিশ নিহতের লাশ উদ্ধার করে সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
নিহত ইউপি সদস্য পিয়ারা খাতুনের বাবা হানিফ সরকার বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তে পুলিশ ও র্যাব যৌথভাবে তৎপরতা চালায় এবং অবশেষে যুবদল নেতা আব্দুল আলিমকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়।
স্থানীয়দের কথায়, পিয়ারা খাতুন ছিলেন একজন সদালাপী, দায়িত্বপরায়ণ ও এলাকার উন্নয়নে সক্রিয় মহিলা নেতা। তার সহকর্মীরা জানান, তিনি ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রমে বিশেষ ভূমিকা পালন করতেন এবং নারী কল্যাণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় আগ্রহী ছিলেন। এই হত্যাকাণ্ড এলাকার মানুষদের মধ্যে শোক ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
র্যাব সূত্রে জানা যায়, গ্রেপ্তারের পর আব্দুল আলিম স্বীকারোক্তি দিয়েছেন যে পারিবারিক বিরোধের জেরে তিনি এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। মামলার যথাযথ তদন্ত চলছে এবং আইন অনুযায়ী দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পেছনের সকল কারণ উদ্ঘাটন করা হবে এবং অপরাধীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে।
সিরাজগঞ্জের এই ঘটনায় নারী নেতাদের নিরাপত্তা ও পরিবারের ভেতরের সহিংসতা নিয়ে নতুনভাবে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের ঘটনা শুধু পারিবারিক নয়, বরং সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতার একটি গভীর সংকেত বহন করে। রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দেয় যে, নারী নেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
স্থানীয়রা জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুরো এলাকা শোকস্তব্ধ। পিয়ারা খাতুনের সহকর্মীরা এবং ইউনিয়নের মানুষ তার মৃত্যুতে ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তারা আশ্বস্ত করেছেন যে, সমাজের অন্য নারীদের প্রতি সহিংসতা রোধে সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা আরও জোরদার হবে।
এ হত্যাকাণ্ড শুধু একটি ব্যক্তিগত ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি নারী নেতৃত্ব, রাজনৈতিক সংখ্যালঘু ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি গভীর মানবিক ও আইনি বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সমাজ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণে বাধা ও সহিংসতা প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
এদিকে, নিহত পিয়ারা খাতুনের পরিবার আশা প্রকাশ করেছে, দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ায় অপরাধীকে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। প্রশাসনও জানিয়েছে, তদন্ত চলমান রয়েছে এবং সমস্ত প্রমাণ ও সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের মাধ্যমে মামলার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা হবে।
সবমিলিয়ে, সিরাজগঞ্জের এই নারী ইউপি সদস্য হত্যাকাণ্ড ও অভিযুক্ত যুবদল নেতার গ্রেপ্তার কেবল একটি অপরাধের ঘটনা নয়, এটি নারীর নিরাপত্তা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে সচেতনতা এবং আইনি ব্যবস্থার দ্রুত কার্যকর হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।