ইসরায়েলি হামলায় দুই শিশুসহ সাত ফিলিস্তিনি নিহত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৪৪ বার
গাজায় ইসরায়েলি হামলায় সাত ফিলিস্তিনি নিহতের বিস্তারিত প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গাজা উপত্যকায় আবারও রক্তক্ষয়ী হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। দক্ষিণ রাফাহ ও উত্তর গাজার জেইতুন এলাকায় পরিচালিত এই হামলায় দুই শিশুসহ সাত ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাঝেও প্রতিদিনের মতো এ হামলা সাধারণ ফিলিস্তিনিদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে। স্থানীয় প্রশাসন, চিকিৎসক এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা জানিয়েছে, এই হামলা যুদ্ধবিরতির আরেকটি সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, যা গাজার মানবিক পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, দক্ষিণ রাফাহ এলাকায় মিশর সীমান্তের কাছে হামাসের যোদ্ধারা তাদের টহলরত চার সেনাকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালায়। তারা নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে পাল্টা অভিযান চালিয়েছে বলেও দাবি করে। তবে গাজা প্রশাসন এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, হামলা মূলত বেসামরিক এলাকার ভেতরেই চালানো হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষ আশ্রয় নিয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন। বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য তৈরি অস্থায়ী শিবির ও তাবুগুলোই হামলার প্রধান ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে পরিণত হয়েছে।

চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে, উত্তর গাজার জেইতুন এলাকায় ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে দুই ব্যক্তি নিহত হন। অপরদিকে দক্ষিণাঞ্চলের আল-মাওয়াসি ক্যাম্পে বিমান হামলায় আরও পাঁচজন প্রাণ হারান। সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানিয়েছেন, আল-মাওয়াসিতে হামলার ঠিক পরপরই কয়েকটি তাবুতে আগুন ধরে যায়। সেসব তাবুতে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলো আগুনে আটকে পড়ায় কেউ কেউ ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে দুই শিশুর একজনের বয়স আট বছর এবং অন্যজনের বয়স দশ বলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। আহতদের মধ্যে অনেকে গুরুতর দগ্ধ, যাদের দ্রুত চিকিৎসা না পেলে মৃত্যুর ঝুঁকি আরও বাড়বে।

এই ঘটনায় অন্তত ৩২ জন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ। অনেকে অগ্নিদগ্ধ, কেউ কেউ বিস্ফোরণের আঘাতে হাত-পা হারিয়েছেন। চিকিৎসা সেবায় সংকট ও ওষুধের ঘাটতির কারণে আহতদের বেশিরভাগই সঠিক চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছেন না। চিকিৎসকরা বলছেন, প্রতিটি হামলা তাদের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করছে। হাসপাতালের বেড নেই, যন্ত্রপাতি নেই, পর্যাপ্ত অক্সিজেন নেই—তবুও তারা প্রাণ বাঁচানোর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, অনেক আহত ব্যক্তির শরীরের ৬০ শতাংশের বেশি পুড়ে গেছে। এ অবস্থায় তাদের বাঁচিয়ে রাখা অত্যন্ত কঠিন। আর যেসব শিশু দগ্ধ হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। দগ্ধ শরীরের যন্ত্রণায় যারা সচেতন রয়েছে, তারা কাঁদারও শক্তি পাচ্ছে না। পরিবারগুলো হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে—প্রতিটি মুহূর্ত তাদের কাছে নতুন শঙ্কা ও আশঙ্কার।

হামাস এই হামলাকে সরাসরি যুদ্ধাপরাধ বলে নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলেছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর থাকা অবস্থায় বেসামরিক মানুষের ওপর বারবার হামলা আন্তর্জাতিক আইন বিরোধী। মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো—বিশেষত মিশর, কাতার ও যুক্তরাষ্ট্র—কে ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে সংগঠনটির পক্ষ থেকে। তাদের বক্তব্য, ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি মানছে না, বরং এটিকে ব্যবহার করছে নিজেদের সামরিক অভিযানের সুবিধাজনক সময় হিসেবে।

গাজার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল অন্তত পাঁচ শতাধিকবার এই চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। এসব ঘটনায় তিন শতাধিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছে প্রায় এক হাজার মানুষ। যুদ্ধবিরতি থাকলেও গাজায় প্রতিদিনই বিস্ফোরণ, গোলাগুলি, ড্রোন হামলা এবং গুলির শব্দ শোনা যায়। আহত মানুষদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা নেই, খাবারের সংকট প্রকট, বিশুদ্ধ পানির অভাব ভয়াবহ। প্রতিটি পরিবার আতঙ্কে, প্রতিটি শিশু ভয় নিয়ে ঘুমায়।

গাজার মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এখন কেবলই ক্ষয়ক্ষতি, মৃত্যু এবং অনিশ্চয়তা। আশ্রয়হীন পরিবারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। শিশুদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ, কাজকর্ম বন্ধ, হাসপাতাল ভরে গেছে আহত ও অসুস্থ মানুষে। নারীদের মাতৃত্বকালীন চিকিৎসা জটিল হয়ে পড়েছে। খাদ্য সহায়তা সীমিত হয়ে আসছে প্রতিনিয়ত। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরাই—তারা তাদের জীবনযুদ্ধের সঙ্গে শৈশবও হারিয়ে ফেলছে।

এই হামলার ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেক দেশ ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতি মানার আহ্বান জানালেও বাস্তবে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা অবস্থায় বারবার হামলা গণহত্যার দিকেই ইঙ্গিত করছে। যদি অবিলম্বে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন না হয়, তাহলে গাজায় মানবিক বিপর্যয় আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

গাজার প্রতিটি মৃত্যুই সেখানে বসবাসকারী মানুষের মনকে আরও শোকাহত করে তুলছে। প্রতিটি পরিবার একজন করে প্রিয়জন হারাচ্ছে; কেউ বাবা হারাচ্ছে, কেউ মা, কেউ সন্তান। শিশুদের মৃত্যু সেখানে সবচেয়ে বড় বেদনাদায়ক দৃশ্য—যে বয়সে তারা খেলাধুলা করবে, স্কুলে যাবে, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখবে, সেই বয়সে তাদের লাশ সাদা কাপড়ে জড়িয়ে কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

এই হামলা গাজায় চলমান মানবিক বিপর্যয়ের বেদনাদায়ক স্মৃতি হিসেবে ইতিহাসে থাকবে। ভবিষ্যত প্রজন্ম হয়তো বই পড়ে জানবে, গাজার মানুষের সহ্যশক্তি কতটা কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গেছে। একের পর এক হামলা, অগ্নিকাণ্ড, মৃত্যু, ক্ষুধা, তৃষ্ণা আর ভয়ে তারা বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। সেই লড়াইয়ে আজকের এই হামলা যোগ হলো নতুন আরেকটি অধ্যায়, যা আবারও প্রশ্ন তোলে—শান্তির প্রতিশ্রুতি কি বাস্তবে কখনও পূরণ হবে?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত