দুই দিনের ভারত সফরে পুতিন, বাড়ছে ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৪৫ বার
দুই দিনের ভারত সফরে পুতিন, বাড়ছে ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আজ দু’দিনের ভারত সফরে পৌঁছাচ্ছেন। দীর্ঘদিন পর এমন একটি উচ্চপর্যায়ের সফর ভারত–রাশিয়া সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। বৈশ্বিক ভূরাজনীতির অস্থিরতা, রাশিয়া–পশ্চিমের সম্পর্কের অবনতি এবং ভারত–মার্কিন সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে এই সফর দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে বড় কৌশলগত আলোচনা সৃষ্টি করেছে। বিকেলের দিকে দিল্লিতে পৌঁছানোর কথা আছে পুতিনের, আর রাতেই তাঁর সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির একান্ত নৈশভোজে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এই নৈশভোজকে সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘ওয়ার্ম-আপ ডিপ্লোমেটিক সেশন’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শুক্রবার সকালে আনুষ্ঠানিক স্বাগত জানানো হবে পুতিনকে। এরপর তিনি রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাবেন—ভারতে আগত বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্য এটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত ও মর্যাদাপূর্ণ অনুষ্ঠান। দিনটির মূল কেন্দ্রবিন্দু হবে হায়দরাবাদ হাউসে ২৩তম ভারত–রাশিয়া বার্ষিক সম্মেলন, যেখানে মোদি ও পুতিন সরাসরি দ্বিপাক্ষিক এবং কৌশলগত আলোচনায় বসবেন। সম্মেলনে অংশ নেওয়া প্রতিনিধিদের জন্য মোদির পক্ষ থেকে কর্মভোজের আয়োজনও করা হয়েছে।

বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তা ব্যাটিং

এই সম্মেলনে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা যে সবচেয়ে গুরুত্ব পাবে, তা বিশেষজ্ঞদের কাছে স্পষ্ট। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ভারতীয় প্রতিরক্ষা কেনাকাটার বেশ কিছু প্রকল্পে বিলম্ব হয়েছে, যা নিয়ে নয়াদিল্লির অসন্তোষ রয়েছে। বিশেষত, রাশিয়া থেকে কেনা এস-৪০০ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের বাকি অংশ সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন ভারতের অগ্রাধিকার। ২০১৮ সালের ৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে পাঁচটি ইউনিট কেনার কথা ছিল। এর মধ্যে তিনটি স্কোয়াড্রন হাতে পাওয়ার পর বাকি দুটি আগামী বছরের মাঝামাঝি সরবরাহের কথা রয়েছে। এই সিস্টেমগুলো ভারতে ‘অপারেশন সিন্দূর’-এ সফল ব্যবহার পেয়েছে, যা রুশ প্রযুক্তির প্রতি ভারতের আস্থার প্রতিফলন।

তবে প্রতিরক্ষা আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে সু-৫৭ পঞ্চম প্রজন্মের রাশিয়ান যুদ্ধবিমান। রুশ প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, ভারত এই বিমানটি নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করতে পারে। নেক্সট-জেনারেশন যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে ভারত বর্তমানে মূল্যায়ন করছে বিভিন্ন মডেল, যার মধ্যে রয়েছে রাফালে, এফ-২১, এফ/এ-১৮ এবং ইউরোফাইটার টাইফুন। সু-৫৭ এ তালিকায় যুক্ত হলে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর হতে পারে।

জ্বালানি নিরাপত্তা এই সফরের আরেকটি মূল আলোচ্য। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও বাজার অস্থিরতার কারণে রুশ তেল আমদানি কিছুটা কমতে পারে বলে আগেই জানিয়েছে মস্কো। তবে পুতিনের সফরকে সামনে রেখে রাশিয়া তেল সরবরাহ অব্যাহত রাখতে চায়—এমন বার্তা ভারতের জন্য কৌশলগত স্বস্তির। ভারতের জ্বালানি নীতি বর্তমানে বহুমুখী উৎসের ওপর নির্ভরশীল হলেও কম দামে রুশ তেল কেনা দেশটির ব্যয় ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

পুতিন–মোদি বৈঠকের বাইরে আলাদা সামরিক বৈঠকে বসবেন দুই দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী—ভারতের রাজনাথ সিং এবং রাশিয়ার আন্দ্রেই বেলৌসোভ। সাম্প্রতিক বিলম্বিত সরঞ্জাম সরবরাহ, যৌথ উৎপাদন প্রকল্প এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতা প্রসঙ্গে আলোচনা হবে এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে। ভারত গত এক দশকে রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ উৎপাদন ও প্রযুক্তি স্থানান্তর বাড়াতে আগ্রহী, বিশেষ করে হালকা যুদ্ধবিমান, সাবমেরিন এবং উন্নত আর্টিলারি সিস্টেমে।

পুতিনের এই সফর এমন সময় হচ্ছে, যখন ভারত–মার্কিন সম্পর্ক কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে এবং রুশ তেল কেনার সঙ্গে যুক্ত পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছে। শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক নতুন পরীক্ষার মুখ দেখছে। এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত রাখতে চাইছে ভারত। সফরের সময় পুতিন মোদিকে ইউক্রেন সংঘাত সমাধান বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ সম্পর্কেও অবহিত করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভারত–রাশিয়ার দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতায় আরেকটি সংবেদনশীল পর্যায়ে পৌঁছেছে। ভারত একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার মনে করে, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। পুতিনের এ সফর সেই সমীকরণকে আরও সূক্ষ্ম, জটিল এবং বহুমাত্রিক করে তুলতে পারে।

সফরের মানবিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দুই নেতার এই বৈঠক দক্ষিণ এশিয়া থেকে শুরু করে বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ভারত রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতায় পুনর্গঠন করতে চাইছে, আর রাশিয়া চাইছে পশ্চিমা চাপের মধ্যেও এশিয়ার বৃহৎ এই অর্থনীতিকে পাশে রাখতে। দুই দেশের ভবিষ্যৎ বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, তেল ও জ্বালানি বাজারের স্থিতি—সবকিছু মিলিয়েই পুতিনের সফর আসন্ন বছরগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘোরাতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

যদিও সফর মাত্র দুই দিনের, তবুও এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। বিশ্ব রাজনীতির বড় পরিবর্তনের সময় এই সফরের প্রতিটি বার্তা, প্রতিটি আলোচনা এবং প্রতিটি কূটনৈতিক অঙ্গভঙ্গিই অঞ্চলীয় কৌশলগত ভারসাম্যে বড় ভূমিকা পালন করবে। প্রশ্ন শুধু একটাই—ভারত–রাশিয়ার সম্পর্ক কি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে, নাকি বিশ্ব-রাজনীতির চাপ তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথ আরও কঠিন করে তুলবে? সময়ই এর উত্তর দেবে, তবে পুতিনের সফর তাৎক্ষণিকভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা ও বিশ্লেষণের জন্ম দিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত