প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বুধবার রাশিয়ায় “জোরপূর্বক স্থানান্তরিত” ইউক্রেনীয় শিশুদের অবিলম্বে ও শর্তহীনভাবে ফেরত পাঠানোর প্রস্তাব গৃহীত করেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালীন এই স্পর্শকাতর বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। প্রস্তাবটি ৯১-১২ ভোটে পাস হয়, যেখানে ৫৭ দেশ ভোটদানে বিরত থাকে এবং রাশিয়া বিপক্ষে ভোট দেয়।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, রাশিয়া যেন জোরপূর্বক স্থানান্তর, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নকরণ, নাগরিকত্ব পরিবর্তন, দত্তক বা পালক পরিবারে শিশুদের পাঠানো এবং রাজনৈতিক বা মতাদর্শগত প্রভাবিত করার মতো সব কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করে এবং অবিলম্বে শিশুদের নিরাপদ ও শর্তহীনভাবে ফিরিয়ে দেয়। এটি কেবল শিশুদের অধিকার রক্ষা নয়, বরং যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের পুনর্গঠন ও শান্তি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ইউক্রেনের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়ানা বেতসা বলেন, “এটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্র–সমর্থিত শিশু অপহরণের ঘটনা। শিশুদের ফিরিয়ে না দিলে ইউক্রেনে ন্যায্য শান্তি অসম্ভব।” ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির পর থেকে রাশিয়া অন্তত ২০,০০০ শিশুকে অপহরণ করেছে বলে ইউক্রেন দাবি করেছে। এর মধ্যে ১,৮৫০-এর বেশি শিশুকে খুঁজে পাওয়া গেছে এবং তারা ফিরে এসেছে।
রাশিয়ার পক্ষ থেকে ডেপুটি ইউএন দূত মারিয়া জাবোলোটস্কায়া প্রস্তাবটিকে “মিথ্যা অভিযোগে ভরা” বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “প্রস্তাবে সমর্থন যুদ্ধ, মিথ্যা ও সংঘাতকে উৎসাহিত করে। বিরোধিতা মানেই শান্তির পক্ষে ভোট।” রাশিয়া স্বীকার করে যে কিছু শিশু সুরক্ষার কারণে সরানো হয়েছিল, কিন্তু অপহরণের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এটি কোন নতুন ঘটনা নয়। ২০২৩ সাল থেকে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় শিশু অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে রাশিয়ার সেনাবাহিনী জাতিসংঘের কালো তালিকায় রয়েছে। একই বছর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে, অভিযোগ—“ইউক্রেনীয় শিশুদের অবৈধভাবে রাশিয়ায় স্থানান্তরের যুদ্ধাপরাধে তার দায় রয়েছে।”
বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি এখন শিশুর অধিকার, যুদ্ধাপরাধ ও শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর। জাতিসংঘের এই প্রস্তাব রাশিয়াকে চাপ সৃষ্টি করবে, যাতে তারা শিশুদের অবিলম্বে ফিরিয়ে দেয় এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রাখে। মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিশুদের নিরাপত্তা ও পরিবারে ফেরত পাঠানো শুধুমাত্র মানবিক বিষয় নয়, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুদের জোরপূর্বক স্থানান্তর যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও মানসিক ক্ষতি সৃষ্টি করে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক পুনর্বাসনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। তাই জাতিসংঘের এই প্রস্তাব শিশুদের নিরাপদে তাদের পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন শান্তি আলোচনার পাশাপাশি শিশুদের ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি সমাধান করা হবে। এটি যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের পুনর্গঠন এবং শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ এবং মানবাধিকার সংস্থার মনোযোগের কারণে আশা করা হচ্ছে, রাশিয়া অবশেষে শিশুদের নিরাপদে ফিরিয়ে দেওয়ার পদক্ষেপ নেবে।
এদিকে, যুদ্ধের মধ্যেই শিশুদের ওপর এমন কার্যক্রম আন্তর্জাতিক নৈতিক ও আইনি দায়বদ্ধতা তৈরি করে। জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্ত শিশু অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যও একটি বার্তা যে, যুদ্ধ চলাকালীন শিশুদের নিরাপত্তা এবং মানবাধিকার রক্ষা অগ্রাধিকার পাবে।
শুধু যুদ্ধ নয়, শিশুদের নিরাপদ পুনর্বাসন, শিক্ষা এবং মানসিক সমর্থন নিশ্চিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ। জাতিসংঘের প্রস্তাব এই প্রক্রিয়াকে আইনগত ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেবে। রাশিয়ার সহিংস কার্যক্রমের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের পুনর্বাসন এবং পরিবারে ফেরত পাঠানো মানবিক দায়িত্বের অংশ।
ইউক্রেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আশা করছে, শিশুদের অবিলম্বে ফিরিয়ে দেওয়া হলে যুদ্ধের প্রভাব কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি এটি শিশুদের মানসিক ও সামাজিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে। জাতিসংঘের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে।