বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কে কি এখনো একাত্তরের ছায়া

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১৩ বার

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক একাত্তর ঘিরে তৈরি নস্টালজিয়া ও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার চাপের মধ্যে এমন এক সড়কবিভাজনে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে পুরোনো কাঠামো ধরে রাখা বা নতুন পথ খোঁজার দ্বিধায় রয়েছে দুই দেশই। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ে ভারতের ভূমিকা, পাকিস্তানবিরোধী কৌশলগত সমীকরণ ও বঙ্গবন্ধুর প্রতি গভীর আবেগ—এই তিন ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা সম্পর্ক আজ সাড়ে পাঁচ দশক পেরিয়ে এসে টানাপোড়েনের মুখে। ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে ক্ষমতার কেন্দ্র বদলে যাওয়ার ফলে কূটনৈতিক আস্থার যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা শুধু দুই দেশের রাজনৈতিক সমীকরণ নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিক অবস্থাকেই নতুন করে ঝাঁকুনি দিচ্ছে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন, বিশেষ করে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন, দুই দেশের সম্পর্ককে এক অনিশ্চিত অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। হাসিনাকে নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার জটিলতা এখন ব্যক্তির গণ্ডি ছাড়িয়ে দুই রাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানকে প্রভাবিত করছে। আদালতের রায়ে তাঁর মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হলেও বিচার কার্যকর করার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের ভেতরে গণ–অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া একাংশ মনে করছে, হাসিনাকে দেশে এনে রায় কার্যকর করা ছাড়া বিকল্প নেই। কিন্তু ভারত যেহেতু তাঁকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছে, তাই তার সম্মতি ছাড়া এই প্রক্রিয়া বাস্তবসম্মত নয়—এই সত্য এখন দুই দেশের সবাই বুঝে গেছে।

ভারতেরও অবস্থান বিপাকে। শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে তারা এখন একদিকে তাকে ফিরিয়ে দিতে পারছে না, কারণ সেটি হাসিনার জন্য মৃত্যুদণ্ডের শামিল হবে এবং বিজেপি সরকারের ওপর প্রবল রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে। অন্যদিকে তাকে ধরে রাখলে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের স্বাভাবিকতা ফেরানো অসম্ভব হয়ে যায়। দুই দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া এই অনাস্থা, ক্ষোভ এবং শূন্যতার সুযোগ নিতে চাইছে পাকিস্তান; আর সুযোগের অপেক্ষায় আছে চীনও। ভারতের জাতীয় স্বার্থের জন্য এ দুটির কোনোটি সুখকর নয়।

বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের এই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পেছনে গবেষকরা যে শব্দটি ব্যবহার করছেন, সেটি হলো ‘গাঠনিক অসাম্য’। ভারতীয় লেখক বিনোদ খোসলা মনে করিয়ে দেন, দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ক দীর্ঘদিন এক ‘স্ট্রাকচারাল অ্যাসিমেট্রি’র ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, যেখানে বাংলাদেশকে সার্বভৌম অংশীদারের বদলে একটি ক্লায়েন্ট স্টেট হিসেবে দেখা হয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে এই কাঠামো আরও মজবুত হয়, যেখানে ভারতীয় নীতিনির্ধারকেরা প্রায়ই ধরে নিয়েছিলেন যে বাংলাদেশ তাদের ওপর নির্ভরশীল, এবং সেই নির্ভরশীলতার ব্যক্তিগত কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন হাসিনা।

হাসিনা নিজেও বিষয়টি জানতেন এবং একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছেন যে তিনি ভারতের জন্য এত কিছু করেছেন যে ভারত তাকে ছাড়া চিন্তাই করতে পারবে না। এই আত্মবিশ্বাসে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক বহু বছর ধরে মূলত ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়ে। কিন্তু এই ব্যক্তি–নির্ভর মডেল দীর্ঘমেয়াদে যে বিপর্যয় ডেকে আনবে, সেই সতর্কতা বহুদিন ধরে দিয়েছিলেন ভারতীয় সামরিক কৌশলবিদ রাজা মোহন। তিনি বলেন, কোনো ক্ষুদ্র প্রতিবেশী দেশ যখন মনে করে তার সার্বভৌমত্ব বৃহৎ রাষ্ট্রের চাপে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, তখন সেখানে ক্ষোভ, অবিশ্বাস এবং জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়া অনিবার্য।

এই ক্ষোভই ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পেছনে জনগণের ভাবনায় শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছিল। নেতাদের নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে এড়িয়ে ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে সম্পর্ক নির্ভর করা—ভারতের এই প্রবণতা নিয়ে সমালোচনায় যুক্ত হয়েছিলেন ভারতের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেননও। তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল, ব্যক্তিকেন্দ্রিক সম্পর্ক সর্বদা ভঙ্গুর; ব্যক্তি পতন ঘটলেই পুরো সম্পর্ক ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বাংলাদেশে সেটিই হয়েছে।

ভারতীয় অভিজাত সমাজের একাংশ এখনো বাংলাদেশের রাজনীতিকে একাত্তরের চশমায় দেখেন। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের আত্মত্যাগ ও সামরিক ভূমিকার কারণে তারা মনে করেন, বাংলাদেশ ভারতের প্রতি চিরস্থায়ী কৃতজ্ঞতা অনুভব করবে। সেই নস্টালজিয়ার ভিত্তিতেই ভারত দীর্ঘদিন ধরে এই ধারণায় ছিল যে, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মও একই আবেগ বহন করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজকের বাংলাদেশে বড় হওয়া তরুণেরা একাত্তরকে শ্রদ্ধা করলেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে দেনা–পাওনার ভিত্তিতে দেখে না। বরং তারা মনে করে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মূল্যবান হলেও বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আরও বেশি মূল্যবান।

এ কারণেই ভারতীয় বিশ্লেষকদের অনেকেই যখন লেখেন যে বাংলাদেশ ‘অকৃতজ্ঞ’, তখন বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম সেটিকে অপমানজনক বলেই দেখছে। সামরিক বিশ্লেষক আশিষ সিং থেকে শুরু করে কর্নেল অভয় পট্টবর্ধন পর্যন্ত বলছেন যে ভারত ছাড়া বাংলাদেশ স্বাধীন হতে পারত না। এই ভাষ্য এখন অনেক বাংলাদেশির কাছে যুগোপযোগী নয় বরং অস্বস্তিকর মনে হয়, কারণ এর মধ্যে সার্বভৌম জাতির প্রতি সম্মানের অভাব রয়েছে।

এই মনোভাব পরিবর্তন না হলে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি ভারতের জন্যই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। কারণ সার্বভৌমত্ব, মর্যাদা ও সমতার প্রশ্নে বাংলাদেশ এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি আত্মবিশ্বাসী। একইসঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্বও বেড়েছে। ভারত তাদের জলবণ্টন, পানিবিদ্যুৎ, বাণিজ্যধস, অশুল্ক বাধা এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে টানাপোড়েন তৈরি করেছে, তা নতুন প্রজন্মের মনে অনাস্থার জন্ম দিয়েছে।

ভারতের সাবেক বৈদেশিক সচিব নিরুপমা রায় স্বীকার করেছেন, তিস্তা নদীর হিস্যা না পাওয়া বাংলাদেশের ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে এবং এটি শুধু পানি নয় বরং আন্তরিকতার প্রতীকও বটে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সুশান্ত সিং মনে করিয়ে দিয়েছেন, বন্ধুত্ব শুধু আবেগ নয়; এটি নীতিগত সিদ্ধান্ত। আর সেই সিদ্ধান্তে প্রমাণ করতে হয় সমমর্যাদার সম্পর্কের প্রতিশ্রুতি।

বাংলাদেশ এখন এমন এক অবস্থায় যেখানে তার বৈদেশিক সম্পর্ক গঠনের মূলনীতি হওয়া উচিত সার্বভৌম স্বার্থের নিরাপত্তা, ব্যক্তিনির্ভর রাজনৈতিক মডেল নয়। ভারতকেও যদি এই সম্পর্ককে বাস্তবসম্মত, টেকসই এবং সমমর্যাদাপূর্ণ স্তরে নিতে হয়, তাহলে একাত্তরের নস্টালজিয়া থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ বা রাষ্ট্র কোনো ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ নয়—এ সত্য বুঝতে পারলেই দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতা পেতে পারে।

অতীতের বন্ধনকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বর্তমানের বাস্তবতা মেনে নিয়ে ভবিষ্যতের পথ গড়া—এটাই এখন সময়ের দাবি। একাত্তরের আবেগ ইতিহাসের অমূল্য অংশ, কিন্তু তার ছায়ায় বন্ধুত্ব আটকে থাকলে দুই দেশেরই ক্ষতি। পরিবর্তন এসেছে, বাস্তবতা বদলেছে, আর সেই বাস্তবতার সঙ্গেই তাল মিলিয়ে এগোতে না পারলে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত মেরুকরণ ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কে নতুন অধ্যায় লিখতে হলে তাই প্রয়োজন সমতা, আস্থা ও আন্তরিকতার নতুন কাঠামো—যা পুরোনো ভুল বোঝাবুঝিকে ছাড়িয়ে সামনে এগোনোর পথ দেখাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত