অকল্যান্ডে লকেট গিলে চুরি, বিপাকে পুলিশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৩২ বার

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

অকল্যান্ডে লকেট গিলে চুরি এমন একটি ঘটনা যা সাম্প্রতিক সময়ে চুরির জগতে সবচেয়ে অদ্ভুত ও নজিরবিহীন কৌশল হিসেবে বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড শহরের নামি গয়নার দোকান ‘পার্ট্রিজ জুয়েলার্স’–এ প্রবেশ করা এক ব্যক্তি কেবল হাতসাফাই করেননি, বরং ডিম্বাকৃতির একটি দুষ্প্রাপ্য ও দামি লকেট মুখে পুরে গিলে ফেলেন—সবার চোখের সামনে। ঘটনাটি ঘটেছে ২৮ নভেম্বর, কিন্তু এর প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীর নানা আলোচনায়। এই অদ্ভুত পরিস্থিতিতে এখন পুলিশও অপেক্ষা করছে অভিযুক্ত ব্যক্তির প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য, যাতে উদ্ধার করা যায় লকেটটি।

অকল্যান্ডের কেন্দ্রস্থলের ব্যস্ততম সড়ক কুইন স্ট্রিটে অবস্থিত ‘পার্ট্রিজ জুয়েলার্স’ নিউজিল্যান্ডের অন্যতম অভিজাত গয়নাবিক্রেতা। দোকানটিতে প্রতিদিন প্রচুর ক্রেতা ভিড় করেন, বিশেষ করে পর্যটকের সংখ্যা থাকে উল্লেখযোগ্য। সেই সুযোগেই ৩২ বছর বয়সী একজন ব্যক্তি সেদিন দোকানে ঢোকেন। দোকানের শৌখিন সাজসজ্জা, আলো ঝলমলে কাঁচের আলমারি আর মূল্যবান জহরতের সামনে দাঁড়িয়ে প্রথমে তিনি সাধারণ একজন ক্রেতার ভঙ্গি বজায় রাখেন। দোকানের কর্মীরা প্রথমদিকে কোনো অস্বাভাবিকতা টের পাননি। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটল এমন কিছু, যা তাদের হতবাক করে দেয়।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ওই ব্যক্তি একটি বিশেষভাবে নির্মিত ফ্যাবার্জে অক্টোপাস লকেট হাতে নেন। এটি ছিল অত্যন্ত মূল্যবান এবং দোকানের অন্যতম আকর্ষণীয় সংগ্রহ। কিছুক্ষণ তা দেখার পর তিনি হঠাৎই সেটা মুখে পুরে ফেলেন। মুহূর্তের মধ্যে লকেটটি তাঁর গলার ভেতর অদৃশ্য হয়ে যায়। ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটে যে আশপাশে থাকা কর্মীরা প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাসই করতে পারেননি। কিন্তু বিষয়টি নিশ্চিত হতেই দোকান কর্তৃপক্ষ দ্রুত নিরাপত্তাকর্মীদের ডাকে এবং পুলিশকে খবর দেয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওই ব্যক্তিকে দোকানের ভেতর থেকেই গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারের সময় পুলিশ তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যায়। কারণ লকেটটির আকার এবং গঠন একেবারেই সাধারণ ছিল না। এটি ছিল ৮ দশমিক ৪ সেন্টিমিটার উচ্চতার ডিম্বাকৃতির একটি লকেট, যা তৈরি হয়েছে ১৮ ক্যারেট সোনা, সবুজ এনামেল, ১৮৩টি হীরা এবং দুটি নীলমণি দিয়ে। এমন একটি উপাদান গিলে ফেলা দেহের অভ্যন্তরে গুরুতর ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই চিকিৎসকদের উপস্থিতিতে অভিযুক্তকে পরীক্ষা করা হয় এবং এর পর থেকে তাকে সার্বক্ষণিক নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। তথাপি লকেটটি এখনো উদ্ধার করা যায়নি, এবং এজন্য পুলিশ অপেক্ষা করছে তার পাকস্থলীর প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে।

ইন্সপেক্টর গ্রে অ্যান্ডারসন স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানান, অভিযুক্তকে আটক করা হলেও এখনো চুরি যাওয়া লকেটটি পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, “আমরা এখন তার স্বাভাবিক দেহীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষায় আছি। একজন কর্মকর্তা তাকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রেখেছে।” চুরি হওয়া বস্তুটি যেহেতু অত্যন্ত মূল্যবান, তাই পুলিশ নিশ্চিত হতে চাইছে যে উদ্ধার প্রক্রিয়ায় কোনো ক্ষতি না হয়।

ঘটনার পরদিন, ২৯ নভেম্বর, অভিযুক্তকে অকল্যান্ড ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে হাজির করা হয়। আদালতে তিনি নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ স্বীকার করেননি, আবার অস্বীকারও করেননি। কেবল হাজিরা দিয়েই আদালত থেকে বেরিয়ে যান। তার আইনজীবীও বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করেননি, শুধুমাত্র বলেছেন যে তার মক্কেল “মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।” আদালতের পরবর্তী শুনানি নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে তদন্তের অগ্রগতি এবং লকেট উদ্ধারের আপডেট পেশ করা হবে।

এই লকেটটির গল্পও কম চমকপ্রদ নয়। এটি মূলত ফ্যাবার্জে ‘এগ লকেট’–এর একটি সীমিত সংস্করণ, যা হলিউড চলচ্চিত্র থেকে অনুপ্রাণিত। ১৯৮৩ সালে মুক্তি পাওয়া জেমস বন্ড সিরিজের চলচ্চিত্র ‘অক্টোপুসি’–র প্লট ঘিরেই তৈরি করা হয়েছিল এই সংগ্রহ। সিনেমাটির কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল গয়না পাচার ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। সেখানে ব্যবহৃত একটি নকল ফ্যাবার্জে এগ ছিল গল্পের বিশেষ উপাদান। বাস্তব জীবনে সেই সিনেমার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মাত্র ৫০টি সীমিত সংস্করণের লকেট তৈরি করে ফ্যাবার্জে কর্তৃপক্ষ, যা কালেক্টরদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। অকল্যান্ডের পার্ট্রিজ জুয়েলার্সের সংগ্রহে থাকা লকেটটি ছিল সেই ৫০টির একটি।

দাম বিবেচনায় এটি আরও আকর্ষণীয়। নিউজিল্যান্ড ডলারে যার মূল্য ৩৩ হাজার, মার্কিন ডলারে প্রায় ১৯ হাজার, আর বাংলাদেশি মুদ্রায় যার দাম ২৩ লাখ টাকার বেশি। এত উচ্চমূল্যের একটি শিল্পকর্ম গিলে ফেলা নিছক চুরির ঘটনা হলেও, এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। কেউ কেউ মন্তব্য করছেন, এটি বিশ্বের সবচেয়ে অদ্ভুত গয়না চুরির ঘটনা। আবার অন্যদের মতে, ঘটনাটি একইসঙ্গে বিপজ্জনক এবং উন্মাদনার শামিল।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি উদ্বেগজনক। একজন মানুষ এত বড় একটি ধাতব শিল্পকর্ম গিলে কীভাবে সুস্থ থাকতে পারেন, তা নিয়ে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরাও বিস্মিত। পাকস্থলীতে বা অন্ত্রে এমন একটি বস্তু আটকে গেলে মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। মেডিকেল টিম তাই অভিযুক্তের শারীরিক অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রেখেছে।

চুরির এই অদ্ভুত কৌশল সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন তুলেছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। গয়নার দোকানগুলো সাধারণত চুরি ঠেকাতে উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যবহার করে, যেমন অ্যালার্ম সিস্টেম, নিরাপত্তা কর্মী, সিসিটিভি এবং কাঁচের নিরাপত্তা কেস। কিন্তু কেউ লকেট গিলে ফেলবে—এমন কৌশল হয়তো কেউই কল্পনা করেননি। আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীও বলছে, এটি তাদের তদন্তে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে, কারণ এমন কৌশলের মোকাবিলা করার উদাহরণ এর আগে খুব বেশি নেই।

যদিও একটি ব্যতিক্রমী ঘটনার কারণে এখন তা বিশ্বমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে, অকল্যান্ড পুলিশের জন্য এটি এখন একটি অপেক্ষার খেলা। লকেটটি উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত মামলার অগ্রগতি শূন্যের কোঠায় থাকবে। চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ও জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে। তবে এর আগে আদালত দেখতে চায় চুরি যাওয়া শিল্পকর্মটিরই বা কী পরিণতি হয়।

এই অদ্ভুত, ঝুঁকিপূর্ণ এবং নাটকীয় চুরির ঘটনায় একদিকে যেমন হাস্যরস জন্মেছে, তেমনি অন্যদিকে আইনি, চিকিৎসাগত ও নৈতিক প্রশ্নও সামনে এসেছে। গয়নার দোকানের কর্মীদের আতঙ্ক, পুলিশের বিভ্রান্তি, চিকিৎসকদের সতর্কতা এবং অভিযুক্তের চরম ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ—সব মিলিয়ে ঘটনা এখন একটি সিনেমার দৃশ্যের মতোই রোমাঞ্চকর।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চুরির প্রযুক্তি বদলাচ্ছে। চোরেরা যতই অভিনব পদ্ধতি আবিষ্কার করছে, নিরাপত্তা ব্যবস্থারও তত পরিবর্তন আনতে হবে। তবে অকল্যান্ডের এই ঘটনা প্রমাণ করেছে, মানুষের কল্পনা কখনো কখনো নিরাপত্তা প্রযুক্তির চেয়েও দূর পর্যন্ত যেতে পারে। আর সেটিই বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিচ্ছে, ঠিক যেমন জেমস বন্ডের সিনেমার মতোই বাস্তব জীবনে অদ্ভুত এক কাহিনি রচিত হলো নিউজিল্যান্ডে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত