প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার যে গল্পটি আন্তর্জাতিক পরিসরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তৈরি পোশাকশিল্প। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এই একটি খাতই দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মোট রপ্তানি আয়ের মধ্যে ৪৭ বিলিয়নের বেশি এসেছে তৈরি পোশাক থেকে। নারীর ক্ষমতায়ন, গ্রামীণ অর্থনীতির সক্রিয়তা এবং দেশের শিল্পায়নের ভিত্তি—সবকিছুর সঙ্গে এই খাত ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। কিন্তু এই সাফল্যের জৌলুসের আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর কাঠামোগত দুর্বলতা—রপ্তানি আয়ের ভয়াবহ অ-বৈচিত্র্য।
একটি স্থিতিশীল অর্থনীতি কখনোই একক খাতে নির্ভর করতে পারে না। বিশ্ববাজারে চাহিদার ওঠানামা, মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক মন্দা, কিংবা ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন—যেকোনো একটি ঘটনা পুরো রপ্তানি কাঠামোকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই বাস্তবতা বহুবার অনুভূত হয়েছে। ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অর্ডার কমে গেলে তৈরিপোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের ধস নামে; তার সরাসরি প্রভাব পড়ে শ্রমবাজার, ব্যাংকিং খাত ও বৈদেশিক আয়ের ওপর। ২০২০ সালের মহামারির সময় বৈশ্বিক লকডাউন ও অর্ডার বাতিলের ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি এক ধাক্কায় ১৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। হাজার হাজার কারখানা উৎপাদন বন্ধ করে দেয়, লাখো শ্রমিকের আয়ের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের ধাক্কা যদি আরেকবার আসে, অর্থনীতির জন্য তার পরিণতি আরও কঠিন হতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে বৈশ্বিক বাজার এখন আর আগের মতো নয়। অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, এবং সরবরাহ শৃঙ্খলার পুনর্বিন্যাস—সব মিলিয়ে শ্রমঘন শিল্পের প্রতিযোগিতা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কম খরচের শ্রম—যা দীর্ঘদিন বাংলাদেশের প্রধান শক্তি ছিল—এখন আর তেমন কার্যকর সুবিধা প্রদান করছে না। ফলে গার্মেন্টসখাত অতির্ভরতার ঝুঁকি এখন আরও স্পষ্ট।
রপ্তানি বৈচিত্র্যের অভাব রাজনৈতিকভাবেও এক ধরনের চাপ তৈরি করছে। দেশের বিপুল যুবসমাজের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করা জরুরি। তৈরি পোশাক খাতে বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ কাজ করলেও উচ্চশিক্ষিত তরুণদের জন্য এই খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলনামূলক কম। উচ্চমূল্যের শিল্প, প্রযুক্তি-নির্ভর পণ্য বা জ্ঞানভিত্তিক খাত না বাড়লে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে ‘মিডল ইনকাম ট্র্যাপ’-এ আটকে যেতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন।
ভৌগোলিকভাবেও বাংলাদেশের রপ্তানি অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র—এই দুই বাজারেই যায় মোট রপ্তানির তিন-চতুর্থাংশ। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য বা পূর্ব এশিয়ার বিশাল বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি খুবই সামান্য। অথচ বিশ্বব্যাপী এই অঞ্চলগুলোই আগামী দশকে দ্রুত বর্ধনশীল ভোক্তা বাজার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ভারতের মতো প্রতিবেশী দেশ ইতোমধ্যেই আফ্রিকার নতুন বাজারগুলো দখলে জোর দিচ্ছে। ভিয়েতনাম একসময় বাংলাদেশের মতোই পোশাক রপ্তানিনির্ভর ছিল; কিন্তু আজ তাদের রপ্তানির প্রায় অর্ধেকই নন-টেক্সটাইল পণ্য যেমন ইলেকট্রনিকস, মোবাইল অ্যাসেম্বলি, আইটি সার্ভিস, কৃষি প্রসেসিং ইত্যাদি থেকে আসে। এই বৈচিত্র্য দেশের অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল করেছে। একইভাবে, মালয়েশিয়া ইলেকট্রনিকস, পাম অয়েল ও সেবা খাতে রপ্তানি সম্প্রসারণ করেছে। আফ্রিকার ইথিওপিয়াও পোশাকের পাশাপাশি কৃষিজ ও চামড়াজাত পণ্যের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
বাংলাদেশ এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে রপ্তানি আয় গত কয়েক বছরে বেড়ে ৬০০ মিলিয়ন ডলারের ঘরে পৌঁছালেও এটি মোট রপ্তানির মাত্র এক শতাংশ। ওষুধশিল্পের আয় প্রায় ২২ কোটি ডলার, কৃষিপণ্য ১.২ বিলিয়ন ডলার। জাহাজ নির্মাণ, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং বা চামড়া খাত—সবকিছু মিলিয়েও পোশাকশিল্পের বিপুল আয়ের তুলনায় এগুলো খুবই সামান্য। এক্ষেত্রে মূল সমস্যার শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় নীতিগত কাঠামোতে। সরকারের প্রণোদনা, ভর্তুকি, রফতানি সহায়তা—সবকিছুই দীর্ঘদিন ধরে গার্মেন্ট খাতেই বেশি কেন্দ্রীভূত। নতুন শিল্পখাত গড়ে তোলার জন্য যে ঝুঁকি গ্রহণের পরিবেশ প্রয়োজন, তা কখনো পূর্ণাঙ্গভাবে তৈরি হয়নি। ফলে উদ্যোক্তারা নতুন খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হননি।
এছাড়া দক্ষ মানবসম্পদের অভাবও বড় বাধা। আইটি, ফার্মাসিউটিক্যাল বা লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং—এসব খাত বিশ্বমানের দক্ষতা দাবি করে। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষা কাঠামো এখনও সেই প্রয়োজন পূরণে যথেষ্ট আধুনিক নয়। গবেষণা, উদ্ভাবন, উচ্চতর প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ—এসব ক্ষেত্রে বিনিয়োগ এখনও খুবই কম। এ কারণে উচ্চমূল্যের রপ্তানি পণ্য তৈরি করার সক্ষমতাও সীমিত রয়ে গেছে।
তবে সম্ভাবনার দরজাও আছে। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী দ্রুত শিখতে সক্ষম, শ্রমনিবিড় শিল্প থেকে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে রূপান্তরের জন্য উপযুক্ত সময় এখনই। আইটি আউটসোর্সিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, বিজনেস প্রসেস ম্যানেজমেন্ট—এসব ক্ষেত্রে ভারত বা ফিলিপাইনের সাফল্য বাংলাদেশের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। কৃষি প্রসেসিং খাতে বিনিয়োগ বাড়ালে বৈশ্বিক বাজারে ভ্যালু-অ্যাডেড খাদ্যপণ্যের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ নতুন করে ভূমিকা রাখতে পারে। একইভাবে, ওষুধশিল্প ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে; লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও শিপবিল্ডিং খাতও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা বহন করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন প্রয়োজন একটি নতুন জাতীয় কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি। যেখানে রপ্তানিকে শুধু পোশাকশিল্পে সীমাবদ্ধ রাখা হবে না; বরং জ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং উচ্চমূল্যের শিল্পকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। বৈশ্বিক অর্থনীতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে, এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে বাংলাদেশ আগামী দশকের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। সস্তা শ্রম আর কম খরচের উৎপাদন দিয়ে ভবিষ্যৎ অর্থনীতি চালানো যাবে না। সময় এসেছে নতুন খাতকে এগিয়ে নেওয়া, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা এবং বিশ্ববাজারে বহুমুখী রপ্তানি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করার।
বাংলাদেশের অর্থনীতি গত কয়েক দশকে অসামান্য সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই অগ্রযাত্রা টেকসই করতে হলে এখনই রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে হবে। শ্রমনির্ভর, কম দামের পণ্যের দেশ থেকে বের হয়ে জ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিল্পের দিকে অগ্রসর হওয়াই হবে বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক রূপান্তরের ভিত্তি।