প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চলকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দখল করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান নিয়ে মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে পাঁচ ঘন্টা আলোচনা গঠনমূলক হলেও, কিছু প্রস্তাব ক্রেমলিনের কাছে অগ্রহণযোগ্য। পুতিনের এই মন্তব্যের ফলে ইউক্রেন-রাশিয়ার মধ্যকার উত্তেজনা আবারও তীব্র রূপ ধারণ করেছে। খবর দিয়েছে আল আরাবিয়া।
বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লি সফরের আগে পুতিন ইন্ডিয়া টুডেকে সাক্ষাৎকারে জানান, যদি ইউক্রেনীয় সেনারা স্বেচ্ছায় ডনবাস অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে না দেয়, তবে রাশিয়া বাধ্য হবে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে অঞ্চলটি দখল করতে। পুতিন আরও বলেন, ‘ইউক্রেনীয় সেনারা যদি স্বেচ্ছায় এই অঞ্চলগুলি ছেড়ে যায় না, আমরা অস্ত্রের জোরে নিয়ন্ত্রণ নেব।’
ডনবাস অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত দোনেৎস্ক এবং লুহানস্কে রাশিয়া-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং ইউক্রেনীয় সেনাদের মধ্যে আট বছর ধরে লড়াই চলছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই লড়াইতে নতুন মাত্রা যোগ করতে রাশিয়া ইউক্রেনে হাজার হাজার সেনা পাঠায়। পুতিনের হুঁশিয়ারি এ লড়াইকে আবারও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নজরকাড়া কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
ইউক্রেন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা রাশিয়ার দাবিকে মানবে না। দেশটি পুনরায় জানিয়েছে যে, তারা তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখবে। বর্তমানে রাশিয়া ইউক্রেনের মোট ১ দশমিক ২ শতাংশ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে, যার মধ্যে ক্রিমিয়াও রয়েছে, যা ২০১৪ সালে রাশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছিল। লুহানস্কের পুরো অঞ্চল এবং দোনেৎস্কের ৮০ শতাংশেরও বেশি, খেরসন ও জাপোরিঝিয়ার প্রায় ৭৫ শতাংশ এবং খারকিভ, সুমি, মাইকোলাইভ ও দনিপ্রোপেট্রোভস্কের কিছু অংশ রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে দোনেৎস্কের প্রায় ৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এখনো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এই অবস্থায় যুদ্ধবিরতি ও সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির রূপরেখা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সময় রাশিয়া বারবার পুরো ডনবাসের নিয়ন্ত্রণ দাবি করেছে। পুতিনের এই হুঁশিয়ারি শুধু স্থানীয় যুদ্ধের দিকনির্দেশনাই নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
ডনবাস অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী সঙ্কট এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষদের জীবনকে প্রায় অচল করেছে। প্রতিদিনই লড়াইয়ে সশস্ত্র সংঘাত এবং নগরায়নের ক্ষয়ক্ষতি দেখা যায়। পুতিনের হুঁশিয়ারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করেছেন যে, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ডনবাস দখলের চেষ্টা বৃহৎ মানবিক সঙ্কট সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সরকার ও সংবাদ সংস্থাগুলো এই পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে। ইউক্রেন এবং রাশিয়ার মধ্যে চলমান উত্তেজনা কেবল দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং ভ্রাতৃত্ববোধের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি রাশিয়া ডনবাসে সামরিক অভিযান চালায়, তাহলে এ অঞ্চলে সশস্ত্র সংঘাতের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে।
ইউক্রেনীয় নেতারা ইতিমধ্যেই বারবার বলছেন, তারা তাদের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার জন্য প্রস্তুত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কিছু দেশ ইউক্রেনকে সমর্থন জানিয়েছে। তারা রাশিয়ার এই হুঁশিয়ারি আন্তর্জাতিক আইন ও সংবিধান লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে। পুতিনের মন্তব্য বিশ্বরাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডনবাসে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দখল চেষ্টা একদিকে রাশিয়ার কূটনৈতিক প্রভাব দেখাবে, অন্যদিকে এটি নতুন শীতল যুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে। পুতিনের হুঁশিয়ারি বিশ্বমঞ্চে রাশিয়ার অবস্থান শক্ত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এছাড়া, ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণাধীন অংশগুলোতে সাধারণ মানুষ ও নিরাপত্তা বাহিনীকে সতর্ক থাকার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, তারা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক চাপে নির্ভরশীল নয়, বরং নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্ত করছে।
বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, পুতিনের হুঁশিয়ারি ডনবাসে নতুন সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়িয়েছে। ইউক্রেনের নিরাপত্তা বাহিনী, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং স্থানীয় জনগণ সবাই এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির দিকে লক্ষ্য রাখছে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা যে, ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাতের সম্ভাব্য পরিণতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং শান্তির ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।