সিলেটে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীকে গাছে ঝুলিয়ে নির্যাতন, গ্রেপ্তার ১

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৩২ বার

প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে চুরির অভিযোগ তুলে এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তরুণকে গাছে ঝুলিয়ে নির্মম নির্যাতনের যে ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে, তা শুধু স্থানীয় নয়, সারাদেশের মানুষের মনে গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। মানবাধিকারের প্রতি এমন ঘৃণ্য অবজ্ঞা এবং সামাজিক নিরাপত্তার প্রতি এমন অশ্রদ্ধা একটি সভ্য সমাজে অগ্রহণযোগ্য। এই নৃশংস ঘটনার জেরে বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশ সন্দেহভাজন মূল অভিযুক্ত আরফান মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তরুণটির নাম জালাল মিয়া, বয়স ২৭। তাঁর এক চোখে দৃষ্টিশক্তি নেই। দক্ষিণ বুড়দেও গ্রামের মৃত আলী আকবরের ছেলে জালালকে গভীর ভোরে চুরির অভিযোগে বাড়ি থেকে জোর করে ধরে নিয়ে যায় কয়েকজন। এ সময় তাঁর প্রতিবন্ধিতার বিষয়টি বিবেচনা না করে, বরং তাকে অবমাননাকর ও নিষ্ঠুর পদ্ধতিতে নির্যাতন করা হয়। এমনকি স্থানীয় মানুষের অনুরোধ ও প্রতিবাদও নির্যাতনকারীদের থামাতে পারেনি।

মামলার এজাহার ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ভোরে কয়েকজন ব্যক্তি জালালকে বাড়ি থেকে বের করে প্রথমে নদীর পাড়ের একটি নৌকায় নিয়ে যান। সেখানেই তাঁর হাত পিছমোড়া করে বেঁধে শুরু হয় মারধর। তাঁর আর্তচিৎকারে আশপাশের কেউ কেউ এগিয়ে আসলেও নির্যাতনকারীরা নিজেদের দমিয়ে রাখেনি। জালালের প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তাকে এক নৌকার ওপর ফেলে বেধড়ক পেটানো হয়। এরপর তাঁকে আবার টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় ইউনুছ আলীর বাড়ির সামনে। সেখানেই গাছের সঙ্গে রশি বেঁধে তাকে ঝুলিয়ে আবারও মারধর করা হয়।

এ ঘটনার একটি ৫৮ সেকেন্ডের ভিডিও প্রথম আলোর প্রতিবেদকের হাতে এসেছে, যা মানুষের মনকে ব্যথিত করে। ভিডিওতে দেখা যায়, জালালের দুই হাত রশি দিয়ে গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। তিনি মরিয়া হয়ে পা দিয়ে মাটি ছোঁয়ার চেষ্টা করছেন। আশপাশে দাঁড়ানো কয়েকজন এ দৃশ্য দেখছিলেন, আর কয়েকজন হাতে লাঠি নিয়ে মারধরের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিছু মানুষ থামানোর অনুরোধ করলেও অভিযুক্তরা তাতে কর্ণপাত করেনি। নির্যাতনের মাত্রা এমন ছিল যে, শেষ পর্যন্ত জালালের মা শিরিয়া বেগম এগিয়ে এসে তাঁকে উদ্ধার করেন এবং কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জালালের মা শিরিয়া বেগম বাদী হয়ে কোম্পানীগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রধান আসামি হিসেবে আরফান মিয়া ও তাঁর ভাই ইউনুছ আলীসহ তাঁদের পরিবারের সদস্য মিলিয়ে ১২ জনকে নামীয় আসামি করা হয়। পাশাপাশি আরও ৫০ থেকে ৬০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়েছে।

কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রতন শেখ বলেন, মামলার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। একজন মানুষের প্রতি এ ধরনের অমানবিকতা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তিনি জানান, পুলিশের অভিযান চলছে এবং মামলার প্রধান আসামি আরফান মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁকে শুক্রবার আদালতে পাঠানো হবে। বাকি আসামিরাও নজরদারিতে রয়েছে, তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে।

এ ঘটনায় স্থানীয়ভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই মনে করছেন, সামাজিক বিচার বা শাস্তির নামে এ ধরনের বর্বর আচরণ শুধু আইনেই নিষিদ্ধ নয়, বরং এটি মানবতার পরিপন্থী। একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীর প্রতি এ ধরনের নিষ্ঠুরতা সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের একটি ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এমন ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নয়, বরং সামাজিক সহমর্মিতার সংকটের প্রতিফলন।

জালালের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, জালাল কখনো কোনও অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তাঁর মায়ের ভাষায়, “আমার ছেলেকে কোনো কারণ ছাড়াই ধরে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। সে প্রতিবন্ধী, সে চুরি করবে কেন? আমার ছেলেকে যে যন্ত্রণা দেওয়া হয়েছে, তা কোনো মা সহ্য করতে পারে না।” তার মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, মানুষের হাতে এমন নৃশংস নির্যাতন কেউ যেন আর না দেখেন।

চুরির অভিযোগ তদন্ত করছে পুলিশ। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে এটি পরিকল্পিতভাবে একজন প্রতিবন্ধীকে হয়রানি এবং ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে বলেও ধারণা করছেন অনেকে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটির ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর দেশব্যাপী নিন্দার ঝড় ওঠে। অনেকে মন্তব্য করেছেন, গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে মারধর করার এই পদ্ধতি মধ্যযুগীয় বর্বরতার স্মরণ করিয়ে দেয়। একজন প্রতিবন্ধীকে এভাবে নির্যাতন করা আইন ও মানবাধিকারের পরিপন্থী।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি নিয়ে ঘটনার প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখা হবে। নির্যাতনকারীরা যতই প্রভাবশালী হোক, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই ঘটনা শুধু একটি ব্যক্তিকে নির্যাতনের ঘটনা নয়, এটি সমাজে ছড়িয়ে পড়া অমানবিকতার নগ্ন প্রকাশ। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত ও সঠিক তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তরুণ জালালের উপর এই নির্যাতন সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়রা বলছেন, যে সমাজে একজন প্রতিবন্ধী মানুষ নিরাপদ নয়, সেই সমাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও মানবিক হতে হবে।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত