প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের তৃতীয় বছরে এসে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে যখন অস্থিরতা আরও গভীর হচ্ছে, তখন ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও অনুষ্ঠিত হলো রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। দুই নেতার এই সাক্ষাৎকে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক সফর বলা যাবে না; বরং যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট, নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সমন্বয় ও পরামর্শ বিনিময়ের একটি তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
শুক্রবার সকালে দিল্লির ঐতিহাসিক হায়দরাবাদ হাউসে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন প্রেসিডেন্ট পুতিন। এর পরই যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়, যেখানে পুতিন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করছে এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় মস্কো প্রস্তুত। তিনি বলেন, যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাব শুধু যুদ্ধরত দেশের ওপর নয়, বরং পুরো বিশ্বের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, জ্বালানি বাজার এবং মানবিক পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। তাই একটি সমাধান খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি।
এ সময় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জানান, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ভারতের অবস্থান পরিবর্তিত হয়নি। ভারত শুরু থেকেই শান্তি, সংলাপ ও কূটনৈতিক সমাধানকে সমর্থন করে এসেছে। সংলাপ ছাড়া কোনো যুদ্ধেরই গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে না—এমন দৃষ্টিভঙ্গিই আবারও তুলে ধরেন মোদি। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি ভারতের সম্মান অপরিবর্তনীয়। একই সঙ্গে তিনি জানান, যুদ্ধবিরতির জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে ভারত সমর্থন করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।
প্রেসিডেন্ট পুতিন দুই দিনের সফরে ভারতে অবস্থান করছেন। বৃহস্পতিবার দিল্লিতে অবতরণের পরই তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। নয়াদিল্লি বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই। দীর্ঘদিনের মিত্র দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে মোদির আলিঙ্গন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়।
রাশিয়া–ভারত সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই গভীর, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে। তবে ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিশেষ করে সস্তায় রাশিয়ান তেল আমদানি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের মাঝে দৃশ্যমান চাপ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে দাবি করে আসছে যে ভারত রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে পরোক্ষভাবে যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করছে। তবে ভারত এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে জানিয়ে এসেছে, তাদের সিদ্ধান্ত সার্বভৌম প্রয়োজন ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে নেওয়া।
নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার তেল পশ্চিমা বাজারে অনায়াসে প্রবেশ করতে না পারলেও ভারত বিপুল পরিমাণে রাশিয়ান অপরিশোধিত তেল কিনে তা পরিশোধন করে বৈশ্বিক বাজারে রপ্তানি করে আসছে। এর ফলে ভারত অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হলেও পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। এমন উত্তেজনার মধ্যেই পুতিন ও মোদির বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাদ যায়নি আন্তর্জাতিক রাজনীতির আরও সাম্প্রতিক বিষয়। আর্কটিক অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং ন্যাটো জোটের সম্প্রসারণ নিয়ে রাশিয়ার উদ্বেগও বৈঠকে আলোচনার বিষয় হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়। শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে ভারত ইতিপূর্বে রাশিয়া ও পশ্চিমাদের মধ্যে যোগাযোগের অনানুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা পালন করেছিল। ইউক্রেন যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতিতেও ভারতের সেই সম্ভাব্য ভূমিকাই আবারও সামনে আসছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ভারত কখনোই রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলোর মতো প্রকাশ্য অবস্থান নেয়নি। বরং তারা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রেখে শান্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এর ফলে মস্কোর কাছে ভারত একটি নির্ভরযোগ্য রাষ্ট্র এবং পশ্চিমাদের কাছে একটি সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিবেচিত হয়। আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোতেও ভারত বেশ কয়েকবার যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার গুরুত্ব তুলে ধরেছে। মোদির বক্তব্য—“এটি যুদ্ধের যুগ নয়”—বৈশ্বিক রাজনীতিতে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।
মস্কো বারবার দাবি করে আসছে, রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে। ন্যাটোর সম্প্রসারণ এবং রাশিয়া সীমান্তে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধিকে তারা হুমকি হিসেবে দেখেছিল। যদিও পশ্চিমা দেশগুলো এই যুক্তিকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে। এ অবস্থায় পুতিনের শান্তিপূর্ণ সমাধান খোঁজার দাবি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, যুদ্ধের ব্যয়বহুল প্রভাব, মানবিক বিপর্যয় ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা রাশিয়াকেও সমাধানের পথ খুঁজতে বাধ্য করেছে।
বৈঠকের দ্বিতীয় অংশে দুই নেতা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ, নিউক্লিয়ার সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করেন। ভারত রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম যৌথভাবে উৎপাদন করছে। বিশেষ করে ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রকল্পে দুই দেশের অংশীদারত্ব উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব বহন করে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার অস্ত্র সরবরাহে বিলম্ব দেখা দিলেও ভারত বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে।
যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্যশস্য, সার, গম ও জ্বালানির বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বেশি পড়েছে। তাই বৈঠকে ভারত এই বৈশ্বিক সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান চেয়েছে। রাশিয়া আশ্বস্ত করেছে যে ভারতের জ্বালানির চাহিদা পূরণে তারা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বিশ্ব যখন যুদ্ধের সমাপ্তি এবং মানবিক বিপর্যয় থামানোর উদ্যোগ খুঁজছে, তখন মস্কো ও নয়াদিল্লির এই যৌথ বার্তা শান্তির জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যদিও যুদ্ধের সমাধানে সত্যিকারের অগ্রগতি কতটা হবে, বা পশ্চিমা শক্তিগুলো এই নতুন কূটনৈতিক সুরে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে—তা এখনও পরিষ্কার নয়।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ভারত ও রাশিয়ার এ বৈঠক এবং পুতিন–মোদির যৌথ বিবৃতি ইউক্রেন সংকটের কূটনৈতিক সমাধান খোঁজার নতুন পর্বের জন্ম দিয়েছে। বিশ্ব অপেক্ষা করছে এই আলোচনার বাস্তব অগ্রগতির।