প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাজেট বেড়ে ৩৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির জটিলতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যেখানে গাজায় যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও দেশটির সামরিক ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। বছরের পর বছর ধরে ইসরাইল নিজেকে নিরাপত্তা হুমকির মধ্যমণি দাবি করে আসছে, তবে চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং অভ্যন্তরীণ সামরিক চাহিদার বিস্তৃতি এই বাজেট বৃদ্ধিকে আবারও বৈশ্বিক নজরে এনেছে। শুক্রবার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, ২০২৬ সালের প্রতিরক্ষা বাজেট ১১২ বিলিয়ন শেকেল বা ৩৪.৬৩ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের খসড়া বাজেটের চেয়েও প্রায় ২২ বিলিয়ন শেকেল বেশি।
বাজেট প্রকাশের এই খবরের সঙ্গে সঙ্গেই দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। গাজায় যুদ্ধবিরতির মধ্যেও কেন এত বড় অঙ্কের বাজেট প্রয়োজন, সেই প্রশ্নে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ উভয়েই কঠোর অবস্থান জানিয়ে বলেন, ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতিতে বড় ধরনের সামরিক প্রস্তুতি অপরিহার্য। তাদের ভাষায়, সামরিক বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি না করলে ভবিষ্যৎ হুমকির মোকাবিলা সম্ভব নয়।
ইসরাইলি নিরাপত্তা কাঠামো অনুসারে বাজেট অনুমোদনের বিষয়টি বেশ কঠোর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রাথমিক পাস হওয়ার পর এটি সংসদের প্রথম দফা ভোটে যাবে। এর পর বাজেট চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে আরও কয়েক দফা পর্যালোচনা হবে। তবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্যই বাড়তি বাজেটের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে ইতিমধ্যে একমত হয়েছেন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাৎজ তার বক্তব্যে দৃঢ়ভাবে বলেন, “আমরা ইসরাইলি সেনাবাহিনীকে আরও শক্তিশালী করতে চাই। যোদ্ধাদের চাহিদা পূরণ করা, তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং রিজার্ভ বাহিনীর ওপর চাপ কমানো আমাদের প্রথম দায়িত্ব। প্রতিটি ফ্রন্টে যেন ইসরাইলের নিরাপত্তা অটুট থাকে, সে জন্যই এই বাজেট।”
তার এই বক্তব্য ইসরাইলের নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘদিনের অবস্থানেরই প্রতিফলন—যে অবস্থান অনুযায়ী দেশটির সামরিক শক্তিই জাতীয় সুরক্ষার মূল ভিত্তি। কাৎজ বলেন, “ইসরাইল বহু ফ্রন্টে বহু বছরের শত্রুতা মোকাবিলা করেছে, ভবিষ্যতেও করবে। সুতরাং সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি বৃদ্ধির জন্য এই বাজেট অপরিহার্য।”
অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ জানান, ২০২৬ সালের প্রতিরক্ষা বাজেট ২০২৩ সালের তুলনায় ৪৭ বিলিয়ন শেকেল বেশি, যা ইসরাইলি সামরিক ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম বাজেট বৃদ্ধি। তার মতে, “এই বছর আমরা সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করতে একটি বিশাল বাজেট বরাদ্দ করছি। এমন একটি বাজেট যা জনগণের উপর চাপ না দিয়ে রাষ্ট্রকে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে।”
ইসরাইলের নিরাপত্তা ও সামরিক নীতিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে গাজা, লেবানন সীমান্ত এবং পশ্চিম তীরে উত্তেজনা বৃদ্ধি, ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর দূরপাল্লার ড্রোন হামলা, ইরানের সঙ্গে বৈরিতা এবং ভেতরের রাজনৈতিক মেরুকরণ—সব মিলিয়ে সামরিক খরচ ক্রমাগত বাড়ছে। যুদ্ধবিরতির মধ্যেও সেনাবাহিনী রিজার্ভ বাহিনীকে প্রস্তুত রাখছে, নতুন প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে।
প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ার আরেকটি বড় কারণ হলো ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর মানবসম্পদের ব্যয়, বিশেষ করে রিজার্ভ বাহিনীর সদস্যদের সুবিধা বাড়ানো নিয়ে সরকারের নতুন উদ্যোগ। গাজায় লড়াই এবং সীমান্তে টানটান উত্তেজনার কারণে রিজার্ভ বাহিনীর সদস্যদের গত দুই বছরে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। তাদের দীর্ঘসময় কর্মস্থল ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হওয়ায় ক্ষতিপূরণ দিতে সরকার বাধ্য হচ্ছে। এই আর্থিক প্যাকেজও বাজেট বৃদ্ধির একটি মূল উপাদান।
ইসরাইলের রাজনৈতিক মহলে বাজেট বাড়ানোর বিরুদ্ধে কিছু মত রয়েছে। বিরোধী দলগুলো বলছে, যুদ্ধবিরতির সময়েও এভাবে সামরিক ব্যয় বাড়ানো জনগণের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে। তাদের মতে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক খাতে বড় কাটছাঁট করে সামরিক খাতে এই অঙ্ক বরাদ্দ করা দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু সরকার বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা বাস্তবতাকে সামনে রেখে এটি ব্যয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাজেট বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশসমূহ এবং আরব বিশ্বে প্রশ্ন উঠছে—যুদ্ধবিরতির পরে সামরিক ব্যয় এত নাটকীয়ভাবে বাড়ানোর পেছনে ইসরাইলের কৌশলগত উদ্দেশ্য কী? কেউ কেউ মনে করছেন, ইসরাইল ভবিষ্যতে ইরান কিংবা হিজবুল্লাহর সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতকে সামনে রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে। আবার অনেকে মনে করছেন, এটি শুধু প্রতিরক্ষা নয়, বরং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার কৌশল।
গাজার পরিস্থিতি শান্ত হলেও মানবিক সংকট এখনও ভয়াবহ। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যুদ্ধবিরতির সুযোগে ত্রাণ সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছে। এমন সময় ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোকে কেউ কেউ ঔদ্ধত্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন। তবে ইসরাইলের সরকার এসব সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে বলছে, দেশের নিরাপত্তা সবার আগে।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানো শুধু দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিরও প্রতিফলন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা জোরদার করছে, জোটবদ্ধ হচ্ছে এবং নতুন অস্ত্র ক্রয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় ইসরাইলও তার আধিপত্য ধরে রাখতে সামরিক খরচ বাড়াচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে, ইসরাইলের ২০২৬ সালের ৩৪ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট—দেশটির ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ সামরিক বিনিয়োগ—একদিকে যখন দেশের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক জলসীমায় নতুন বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। গাজার যুদ্ধবিরতির মধ্যেও এই বাজেট বৃদ্ধি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ইসরাইল কোনও ঝুঁকি নিচ্ছে না, বরং ভবিষ্যতের সকল সম্ভাব্য হুমকির জন্যই আগেভাগে শক্ত প্রতিরক্ষা প্রাচীর গড়ে তুলছে।