প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
মার্কিন গমবাহী জাহাজ চট্টগ্রামে এসে নোঙর করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরকার টু সরকার ভিত্তিক গম আমদানি কার্যক্রমের অগ্রগতি আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং বাজার স্থিতিশীলতায় এই বড় ধরনের চালান নতুন আশ্বাস বয়ে আনছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা এবং আমদানিকারক সংস্থাগুলো। বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রাম বন্দরের বহিঃনোঙরে পৌঁছায় এমভি লোল্যান্ডস পাতরাশি নামের জাহাজটি, যার মাধ্যমে এসেছে ৬০ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন গম।
বাংলাদেশ সরকার ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক–এমওইউ–এর অধীনে সম্পাদিত জি-টু-জি-০১ চুক্তি অনুযায়ী এটি চতুর্থ চালান। চুক্তির অধীনে মোট ৪ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন গম আমদানি করা হবে। ইতোমধ্যে প্রথম তিনটি চালানে দেশে পৌঁছেছে মোট ১ লাখ ৭৮ হাজার ৬৩৬ মেট্রিক টন গম। সেগুলো এসেছে যথাক্রমে ২৫ অক্টোবর, ৩ নভেম্বর এবং ১৫ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে। চতুর্থ চালানসহ এখন পর্যন্ত মোট ২ লাখ ৩৯ হাজার ৫৮৬ মেট্রিক টন গম এসে পৌঁছেছে বাংলাদেশের গুদামব্যবস্থার আওতায়।
চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, বহিঃনোঙরে পৌঁছানোর পরই দ্রুততার সঙ্গে গমের নমুনা সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। খাদ্য বিভাগের প্রতিনিধি, বন্দরের প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং গুণগতমান পরীক্ষকরা যৌথভাবে নমুনা সংগ্রহ করেন। দেশের খাদ্যশস্য আমদানিতে মান নিয়ন্ত্রণের বিধি অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মানের একাধিক পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যেতে হয় গমকে। সেই প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে এলেই খালাসের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের খাদ্য বিভাগ জানিয়েছে, গমের বাজারে গত কয়েক মাস ধরে যেসব অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, এই বৃহৎ চালানগুলো তা কাটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে রুটির বাজার, নুডলস, বেকারি, শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত গম এবং খোলাবাজারে বিক্রি হওয়া আটা—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত প্রভাব পড়বে। এর ফলে নিত্যপণ্যের দামে স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা করছেন তারা।
সরকারি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছর আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যশস্যের দামে ওঠানামা থাকায় সরকার আমদানির উৎসকে বৈচিত্র্যময় করতে আগ্রহী। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বব্যাপী উচ্চমানের গম উৎপাদনে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যে এই গম আমদানির নতুন চুক্তি উভয় দেশের জন্যই বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করেছে। চুক্তি অনুযায়ী, ধারাবাহিকভাবে ৪ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন গম প্রাপ্তি বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে নতুন করে শক্তিশালী ভিত্তি দিচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরেই দেশের খাদ্যশস্য আমদানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে বন্দরের জট কমানো, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং দ্রুত খালাস প্রক্রিয়া নিশ্চিতের ফলে বড় আকারের চালানগুলো দ্রুত দেশের খাদ্যগুদামে পৌঁছাতে পারছে। বন্দরের এক কর্মকর্তা জানান, নমুনা পরীক্ষার পর গমের মান নিশ্চিত হলে এটিকে দ্রুত খালাস করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। গম পরিবহন করবে সরকারি গুদামের ট্রাক, খাদ্য অধিদপ্তরের অনুমোদিত পরিবহনকারী এবং নৌ-বাহনের সংমিশ্রিত বহর।
খাদ্যশস্য আমদানির এই প্রক্রিয়া শুধু দেশের শিল্প ও বাজারব্যবস্থায় প্রভাব ফেলে না, বরং লক্ষাধিক ভোক্তার খাদ্যচাহিদা পূরণেও অবদান রাখে। ফলে প্রতিটি চালানই দেশের অর্থনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে। খাদ্য বিভাগ মনে করছে, নিয়মিত আমদানি চালানের মাধ্যমে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির সম্ভাবনা অনেকাংশেই কমে যাবে এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের সক্ষমতা আরও বাড়বে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা এই গমের চালান সরাসরি মানসম্মত পণ্যের জোগান নিশ্চিত করবে, যা দেশের বিভিন্ন বেকারি ও খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য ইতিবাচক বার্তা বয়ে আনে। আমদানির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বাজারে দামের স্থিতি আরও সুসংহত হবে বলেও মনে করছেন তারা।
চট্টগ্রাম বন্দরে এখন নৌযান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বড় আকারের জাহাজও সহজেই নোঙর করতে পারছে। বন্দরের বহিঃনোঙরে অবস্থানরত এমভি লোল্যান্ডস পাতরাশি জাহাজটি দেশের আমদানি কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার নতুন নিদর্শন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ যথাসময়ে আমদানির চুক্তি বাস্তবায়ন করে দেশের খাদ্যসুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
প্রসঙ্গত, গমের নমুনা পরীক্ষায় কোনো জটিলতা না থাকলে অতি দ্রুত জাহাজ থেকে গম খালাস করা হবে। এরপর দেশের বিভিন্ন গুদামে সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। খাদ্য বিভাগ জানিয়েছে, বাজারে চাহিদা পূরণে প্রয়োজনে আরও চালান আনার পরিকল্পনাও রয়েছে। গম আমদানির এ কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে গম-সম্পর্কিত সকল পণ্যের বাজার মূল্যে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও বাজার ব্যবস্থাপনায় এই বৃহৎ গম আমদানি শুধু তাৎক্ষণিক সুরাহাই আনবে না, দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।