প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির উত্তাপ এবার নিউইয়র্ক সিটির নগর প্রশাসনকেও স্পর্শ করেছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ঘিরে এক ব্যতিক্রমধর্মী বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। নিউইয়র্ক সিটির নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানির গ্রেফতারের প্রতিশ্রুতি এবং এ বিষয়ে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ক্যাথি হোচুলের সরাসরি বিরোধিতা—এই দুই বিপরীত অবস্থান ঘিরেই তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক ও আইনি আলোচনা। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং আন্তর্জাতিক ও মার্কিন গণমাধ্যমেও এটি নিয়ে বিস্তৃত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর, গভর্নর ক্যাথি হোচুল এক সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “নিউইয়র্ক সিটির মেয়রের এমন কোনো আইনগত ক্ষমতা নেই যে তিনি কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে গ্রেফতার করতে পারেন।” গভর্নরের এই বক্তব্য আসে মামদানির আগের একাধিক মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে, যেখানে তিনি প্রতিবারই প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছিলেন—ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী যদি কখনো নিউইয়র্ক সফরে আসেন, তবে তিনি তাকে গ্রেফতার করার চেষ্টা করবেন। ক্যাথি হোচুল নিজেকে একজন ইসরাইলপন্থি হিসেবে পরিচিত বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, এই ধরনের বক্তব্য শহরের নাগরিকদের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
আগামী ১ জানুয়ারি নিউইয়র্ক সিটির মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন জোহরান মামদানি, যিনি এরই মধ্যে প্রগতিশীল ও স্পষ্টভাষী রাজনীতিক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে ইসরাইল সরকারের সমালোচক হিসেবে তার অবস্থান সুপরিচিত। তার এই কঠোর অবস্থান নিউইয়র্কের ইহুদি সম্প্রদায়ের একটি অংশকে উদ্বিগ্ন করেছে। অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, তার এমন বক্তব্য শহরের সামাজিক সম্প্রীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
মামদানি তার বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) থেকে জারি করা একটি অনুমিত গ্রেফতারি পরোয়ানার কথা। তিনি দাবি করেছেন, আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে বিশ্বের যেকোনো স্থানে এই পরোয়ানা কার্যকর করা উচিত। তবে এখানেই শুরু হয়েছে সবচেয়ে বড় বিতর্ক। যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্য রাষ্ট্র নয়, ফলে আদালতটির এখতিয়ার সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে প্রযোজ্য নয়। এর পাশাপাশি দেশটির ফেডারেল আইন অনুযায়ী স্থানীয় সরকার বা অঙ্গরাজ্য সরকার আইসিসির সঙ্গে কোনো ধরনের সহযোগিতা করতে পারে না।
আইন বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মামদানির হুমকির কোনো শক্ত আইনি ভিত্তি নেই। মার্কিন সংবিধান ও ফেডারেল আইন অনুযায়ী, বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানরা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে কূটনৈতিক সুরক্ষা ভোগ করেন, বিশেষ করে যদি তারা জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের মতো আন্তর্জাতিক ফোরামে যোগ দিতে আসেন। তাদের আটক করা বা চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা সরাসরি ফেডারেল অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ফলে মামদানির বক্তব্য বাস্তবায়নের পথে আইনি বাধা অত্যন্ত শক্তিশালী।
এমন বিতর্কের মধ্যেই ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, তিনি নিউইয়র্ক সফরের পরিকল্পনায় অটল রয়েছেন। তিনি প্রতি বছরই জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক সফর করেন এবং এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না বলে জানিয়েছেন ঘনিষ্ঠ মহলে। তার এই বক্তব্য নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে—একদিকে রয়েছে স্থানীয় প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে রয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির সংবেদনশীল একটি অধ্যায়।
পরিস্থিতির মানবিক দিকটিও উল্লেখযোগ্য। নিউইয়র্ক বিশ্বের অন্যতম বহুজাতিক ও বহুধর্মীয় শহর হিসেবে পরিচিত। এখানে ইহুদি, ফিলিস্তিনি, আরব এবং অন্য মধ্যপ্রাচ্য বংশোদ্ভূত নাগরিকদের একটি বড় অংশ বসবাস করে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির উত্তাপ যখন স্থানীয় রাজনীতিতে এসে লাগে, তখন সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। সম্প্রতি নিউইয়র্কে আয়োজিত কিছু বিক্ষোভ ও সমাবেশে সেই উত্তেজনার প্রতিফলন দেখা গেছে, যেখানে কেউ নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, আবার কেউ ইসরাইলের নিরাপত্তার পক্ষে স্লোগান তুলেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মামদানির বক্তব্যের বাস্তবায়ন সম্ভব না হলেও এটি স্পষ্টভাবে একটি প্রতীকী রাজনৈতিক অবস্থান। এটি মূলত একটি অন্তর্দ্বন্দ্বের প্রতিফলন—যেখানে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, কূটনৈতিক প্রথা এবং ফেডারেল-স্থানীয় ক্ষমতার সীমারেখা মুখোমুখি হয়েছে। গভর্নর হোচুলের বক্তব্য এই বিতর্ককে আইনি বাস্তবতার ভেতরে টেনে এনেছে, যেখানে আবেগ বা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির চেয়ে আইন ও সংবিধান বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
এই ঘটনার ফলে নিউইয়র্ক সিটির রাজনীতিতে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক। একদিকে, নতুন মেয়রের আবির্ভাবের আগেই তার বক্তব্য শহরের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিচিতিকে প্রভাবিত করছে। অন্যদিকে, অঙ্গরাজ্য ও ফেডারেল সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিরোধের প্রতিফলন যতই শক্তিশালী হোক না কেন, স্থানীয় প্রশাসনের ক্ষমতার একটি সুস্পষ্ট সীমা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, নেতানিয়াহুকে গ্রেফতার করার প্রতিশ্রুতি ও তা ঘিরে গভর্নরের প্রতিক্রিয়া শুধু একটি আইনি প্রশ্ন নয়—এটি হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মানবাধিকার বিতর্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রতিচ্ছবি। সামনের দিনে বিষয়টি আরও কতটা বিস্তৃত হবে, তা নির্ভর করছে নিউইয়র্ক সিটির নতুন নেতৃত্ব, ফেডারেল প্রশাসনের অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলমান ঘটনাপ্রবাহের ওপর। তবে আপাতত এটুকু নিশ্চিত, এই ইস্যু নিউইয়র্কের রাজনীতিকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।