প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দরপতনের প্রভাব এবার স্পষ্টভাবে পড়েছে বাংলাদেশের বাজারেও। আন্তর্জাতিক বাজারে টানা কয়েক দিনের নিম্নমুখী প্রবণতার পর দেশের জুয়েলারি খাতের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) স্বর্ণের দাম কমানোর ঘোষণা দিয়েছে, যা কার্যকর রয়েছে আজ রোববার, ৭ ডিসেম্বর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পোস্ট ও বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক এবং অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এবার প্রতি ভরিতে দাম কমেছে এক হাজার টাকারও বেশি, যা সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ এবং আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বাজুসের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) সমন্বয় করে নির্ধারিত এই নতুন মূল্যই আজ দেশের বাজারে কার্যকর রয়েছে। স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণ বা পিওর গোল্ডের দাম হ্রাস পাওয়াকে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি। দীর্ঘদিন ধরে মূল্যবৃদ্ধির চাপে থাকা স্বর্ণের বাজারে এটি এক ধরনের স্বস্তির খবর হয়ে এসেছে অনেকের কাছে, বিশেষ করে যারা বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা বিনিয়োগের জন্য স্বর্ণ কেনার কথা ভাবছিলেন।
নতুন মূল্যতালিকা অনুযায়ী, দেশের বাজারে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ৯৫ টাকা, যেখানে এর আগের দাম ছিল ২ লাখ ১২ হাজার ১৪৫ টাকা। অর্থাৎ এক ধাক্কায় প্রতি ভরিতে ১ হাজার ৫০ টাকা কমেছে এই ক্যাটাগরির স্বর্ণের দাম। একই সঙ্গে ২১ ক্যারেট স্বর্ণের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি ভরি ২ লাখ ১ হাজার ৪৯৬ টাকা, যা মঙ্গলবারের তুলনায় কিছুটা কম। ১৮ ক্যারেট স্বর্ণের দাম এখন প্রতি ভরি ১ লাখ ৭২ হাজার ৭০৯ টাকা, এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দাম নির্ধারিত হয়েছে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৬৮৯ টাকা।
দেশের স্বর্ণের বাজারে এই দামের পরিবর্তন শুধু ব্যবসায়ীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নগরীর বিভিন্ন জুয়েলারি মার্কেটে দেখা গেছে, অনেকে দাম কমার খবরে দোকানে খোঁজখবর নিতে যাচ্ছেন। কেউ বিয়ের জন্য গহনার অর্ডার দিতে, কেউ পুরোনো স্বর্ণ বদলে নতুন গহনা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চমূল্যের কারণে অনেকেই স্বর্ণ কেনার পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছিলেন। নতুন এই মূল্য অনেকের কাছে আবারও সেই পরিকল্পনা বাস্তবের দিকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ এনে দিয়েছে।
বাজুস জানিয়েছে, এই ঘোষিত মূল্যের সঙ্গে সরকার-নির্ধারিত ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং সংস্থাটির নির্ধারিত ন্যূনতম ৬ শতাংশ মজুরি যোগ করেই গ্রাহকদের স্বর্ণালঙ্কার কিনতে হবে। তবে বাস্তবে গহনার ডিজাইন, কারুকাজ এবং মানভেদে মজুরির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। ফলে প্রতি ভরির ঘোষিত দাম শুনে অনেকেই যে মোট খরচ অনুমান করেন, চূড়ান্ত বিল তার চেয়ে বেশি হতে পারে। এ বিষয়টি নিয়েও ক্রেতাদের মধ্যে প্রশ্ন, আলোচনা এবং সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারের এই সংযোগ নতুন কিছু নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন দাম বাড়ে বা কমে, তার প্রভাব কয়েক দিনের মধ্যেই স্থানীয় বাজারে প্রতিফলিত হয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক মুদ্রানীতি, ডলার-সূচকের ওঠানামা, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রবণতা—সব মিলিয়েই মূলত স্বর্ণের দামের গতিপথ নির্ধারিত হয়। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের বাজারেও দাম সমন্বয় করা হয়ে থাকে।
অনেক বিশ্লেষক বলছেন, স্বর্ণের দাম কমার এই প্রবণতা যদি আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকে, তাহলে তা দেশের জুয়েলারি শিল্পের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। ব্যবসায়ীরা যেমন বেশি বিক্রির আশা করছেন, তেমনি ক্রেতারাও তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক পরিবেশে কেনাকাটার সুযোগ পাবেন। তবে একই সঙ্গে সতর্ক কণ্ঠও রয়েছে—বিশ্ববাজার যেকোনো সময় আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে, ফলে এই কম দাম দীর্ঘস্থায়ী না-ও হতে পারে।
এ সময় অনেক সাধারণ মানুষ বলছেন, স্বর্ণ শুধু অলংকার নয়, অনেক পরিবারের কাছে এটি নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম। মেয়ের বিয়ের জন্য আগেভাগে স্বর্ণ কেনার প্রবণতা বাংলাদেশে বহুদিনের। দাম কমায় সেই স্বপ্ন এখন কিছুটা হলেও হাতের নাগালে এসেছে বলে মনে করছেন অনেকে। অন্যদিকে যারা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তারা বলছেন—মূল্য স্থিতিশীল থাকলে বাজারে স্বচ্ছতা বাড়ে, যা ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের জন্যই ভালো।
সব মিলিয়ে, ৭ ডিসেম্বর দেশে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরির নতুন দাম নির্ধারণ শুধু একটি অর্থনৈতিক তথ্য নয়; এটি বহু মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। কখনও এটি বিয়ের আনন্দের অংশ, কখনও ভবিষ্যতের নিরাপত্তার প্রতীক, আবার কখনও পারিবারিক ঐতিহ্যের স্মারক। মূল্য কমার এই খবর তাই শুধু বাজারের পরিসংখ্যানেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের দৈনন্দিন আলোচনায়, প্রত্যাশায় এবং আশায়।