প্রকাশ: ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা এবং শিক্ষা-সংস্কৃতির জগতে নিজস্ব আলোয় আলোকিত এক উজ্জ্বল নাম অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ। আজ তাঁর ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। সময়ের স্রোতে আরেকটি বছর পেরিয়ে গেলেও তিনি এখনও বাংলার প্রাজ্ঞ বুদ্ধিজীবীদের অগ্রপথিক ও প্রগতিশীল চেতনার এক অনন্য প্রতীক হিসেবে স্মরণীয়। তাঁর জীবন, কর্ম এবং মতাদর্শের মূল্যায়ন যতদিন যাবে ততই নতুন প্রজন্মের কাছে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে—এমনটাই মনে করেন গবেষক, শিক্ষাবিদ ও সমকালীন বিশ্লেষকেরা।
সোমবার সকালে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁর সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, দোয়া ও স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। পরিবার, শুভানুধ্যায়ী, সাবেক সহকর্মী, শিক্ষার্থী এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকরা তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন। এর পাশাপাশি দুস্থ শিশুদের মাঝে খাবার বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে সমাজসেবায় তাঁর মানবিক আদর্শের প্রতিফলন ঘটে। এমন উদ্যোগ তাঁর মানবিক ও ন্যায়নিষ্ঠ দর্শনের সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ, যা তিনি সারাজীবন লালন করেছেন।
অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ কেবল একজন শিক্ষাবিদই ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলা বুদ্ধিবৃত্তির মুক্তচিন্তার যোদ্ধা। ১৯৫০ ও ৬০–এর দশকের উত্তাল সময় থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বাপর সময়ে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম চিন্তাশীল ব্যাখ্যাতা হিসেবে উঠে আসেন। তাঁর লেখনী, বক্তৃতা এবং চিন্তাশীল পরামর্শ তৎকালীন ছাত্রসমাজ, তরুণ প্রজন্ম ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। দেশভাগ, পাকিস্তানি শোষণ, বঞ্চনা ও সাংস্কৃতিক দমননীতির বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন এক নির্ভীক কণ্ঠস্বর।
মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ও সংগঠনে অধ্যাপক মুরশিদের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। তিনি স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তাঁর আন্তরিকতা, অঙ্গীকার ও ত্যাগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে শক্তিশালী করেছে। যুদ্ধের সময় দেশের মেধা, চেতনা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে তিনি ছিলেন অন্যতম বুদ্ধিজীবী প্রতিনিধি। তাঁর সততা ও নৈতিক অবস্থান দেশের মুক্তিকামী মানুষের মননে গভীর ছাপ ফেলেছিল।
স্বাধীনতার পরও দেশগঠনের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর প্রভাব ছিল দৃষ্টিগোচর। তিনি শিক্ষা, সমাজতত্ত্ব, নীতি-আদর্শ এবং সাংস্কৃতিক উন্নয়ন সম্পর্কে স্বকীয় ও উন্নত দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় রেখেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন জ্ঞানচর্চা, সততা ও মানবিকতার ভিত্তিতে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে ওঠে। তাঁর ধারণা ও লেখাগুলো এখনও নীতিনির্ধারক, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক–শিক্ষার্থীদের কাছে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এগুলো কেবল অতীতের ব্যাখ্যা দেয় না; ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা হিসেবেও কাজ করে।
ব্যক্তিজীবনে অধ্যাপক মুরশিদের পরিচয় ছিল গভীরভাবে মানবিক ও নীতিবান। তিনি সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে সমান সহজতায় মিশতে পারতেন। সহকর্মীদের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁকে এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। অনেকে তাঁকে বর্ণনা করেন ‘নৈতিকতার পথপ্রদর্শক’ হিসেবে। তিনি বিশ্বাস করতেন জ্ঞান শুধুই মস্তিষ্কের অনুশীলন নয়, বরং সমাজ পরিবর্তন ও মানুষের কল্যাণে এর প্রভাব থাকা জরুরি।
তাঁর পরিবারও দেশের নীতি ও প্রশাসন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সমাজকল্যাণ বিষয়ক উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ তাঁরই মেয়ে। পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে প্রতিফলিত হয় অধ্যাপক মুরশিদের মূল্যবোধ, দেশপ্রেম ও নৈতিকতার শিক্ষা আজও তাদের পথনির্দেশ করে। তাঁর জীবনদর্শন তাদের কাছে এক ধরনের প্রেরণার উৎস।
প্রতিবছর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন, শিক্ষা–প্রতিষ্ঠান ও গবেষকসমাজ তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা করে থাকে। অনেকেই মনে করেন, বর্তমান সময়েও তাঁর চিন্তাধারা বাংলাদেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে প্রশস্ত ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষাব্যবস্থা, মানবিক মূল্যবোধ, ন্যায়নীতি ও দেশপ্রেম বিষয়ে তাঁর অবস্থান নতুন প্রজন্মের জন্যও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেশ যখন নানা সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ও নৈতিকতা আমাদের চিন্তা ও কর্মকে পুনর্গঠনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী নিধনে যে অন্ধকার সময় ইতিহাসে লিপিবদ্ধ, সেখানে খান সারওয়ার মুরশিদ ছিলেন আলোকবর্তিকার মতো। তাঁর চিন্তাশক্তি, সততা, নৈতিকতা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। তাঁর লেখা, ভাষণ ও মতামত আজও পাঠকদের অনুপ্রাণিত করে। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী তাই কেবল একজন মানুষের প্রয়াণ স্মরণ নয়, বরং একটি চিন্তাধারার, একটি সত্যের, একটি মুক্তমনের আলোকে স্মরণ করা।
আজ তাঁর ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকীতে যখন গণমানুষ, শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছে, তখন আবারও স্মরণ করা হচ্ছে তাঁর সেই অমূল্য অবদান, যা বাঙালির আত্মপরিচয়, মুক্তি-সংগ্রাম এবং সামাজিক অগ্রগতির ভিত্তিকে শক্তিশালী করেছে। অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ ছিলেন এক আলোকবর্তিকা, যার আলো ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে পথ দেখাবে আরও দীর্ঘসময়।