প্রকাশ: ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের পেঁয়াজ বাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অস্থিরতা আবারও নতুন করে তীব্র হয়ে উঠেছিল সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে। বাজারে পেঁয়াজের দাম হঠাৎ করে অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্রেতাদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছায়। ভোক্তারা যখন প্রতিদিনই বাজারে গিয়ে মূল্যদহন অনুভব করছিলেন, তখনই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একটি তথ্য সরকারের কাছে পরিস্থিতি বদলানোর সুযোগ এনে দেয়। জানা যায়, বাজারে প্রভাব বিস্তারকারী একটি সিন্ডিকেট ইচ্ছাকৃতভাবে পেঁয়াজের সংকট তৈরি করে দাম বাড়াচ্ছিল এবং এমনকি আমদানি বন্ধ থাকলে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ২০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। ফলে সরকার দ্রুত আমদানির অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, আর সেই সিদ্ধান্ত কার্যত পুরো বাজারেই বড় ধরনের পরিবর্তন এনে দেয়।
সরকারের আমদানির ঘোষণা আসার মাত্র ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের দামে নজিরবিহীন দরপতন হয়। যে নতুন পেঁয়াজ শনিবার রাতেও প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, তা রোববার সকালে অর্ধেক দামে নেমে আসে। নতুন পেঁয়াজ কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হতে শুরু করে। একইভাবে পুরোনো পেঁয়াজের দামও ৩০ থেকে ৪০ টাকা কমে ১০০ থেকে ১১০ টাকায় নেমে আসে। বাজারে ক্রেতার চাপে ভোগা মানুষরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেও ব্যবসায়ীদের একটি অংশ পড়ে যায় চরম বিপাকে। কারণ, উচ্চ দামে পণ্য মজুত করা অনেক ব্যবসায়ীরই হঠাৎ দরপতনে বড় ধরনের লোকসান গুণতে হচ্ছে।
কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী আশরাফ হোসেন জানান, গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বাজার যখন উর্ধ্বমুখী তখন বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছিল। বাজারে তখন চাহিদা ছিল তুফান তোলা। কিন্তু শনিবার ভোরের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। আমদানির খবরে ক্রেতারা বাজার থেকে সরে যেতে শুরু করেন। ফলে বাজারে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ জমে যায়, কিন্তু ক্রেতার দেখা মেলে না। আশরাফের ভাষায়, দাম কমলেও বাজারে ক্রেতা কমে গেছে। নতুন পেঁয়াজ আগের দামের অর্ধেকে নেমে এসেছে, কিন্তু ক্রেতারা মনে করছেন আরও কমবে—তাই তারা অপেক্ষা করছেন।
একই বাজারের আরেক ব্যবসায়ী মনির হোসেন জানান, তিনি ২০ বস্তা পেঁয়াজে প্রায় ৪০ হাজার টাকা লোকসান ধরেই বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন, তবুও ক্রেতার দেখা নেই। কয়েক দিন আগে পেঁয়াজের চাহিদা এত বেশি ছিল যে ক্রেতারা দাম চাইলেই কিনে নিতেন। কিন্তু আমদানির অনুমতির খবর বাজারে আসার পর চাহিদা একেবারেই কমে গেছে। যে পেঁয়াজ দুটি দিন আগে উচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছিল, এখন তা কম দামে বিক্রির পরও বিক্রি হচ্ছে না।
খুচরা বাজারের চিত্রও একই রকম, যদিও সেখানে দাম কমার হার পাইকারির তুলনায় ধীর। রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা দোকানে পুরোনো পেঁয়াজ এখনো ১২০ থেকে ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, আর নতুন পেঁয়াজ ৯০ থেকে ১০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। পাড়া-মহল্লার দোকানে পুরোনো পেঁয়াজ এখনো ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেকেই বলছেন, পাইকারিতে দাম কমলেও খুচরা বিক্রেতারা এখনো আগের দামে বিক্রি করে বেশি লাভ করার চেষ্টা করছেন।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক ড. জামাল উদ্দীন বলেছেন, মাত্র একদিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকা কমে যাওয়া স্পষ্টই দেখিয়ে দেয় যে বাজারে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। তাঁর ভাষায়, আমদানির অনুমতি দেওয়া না হলে এই চক্রটি দাম কেজিতে ২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ফলে সরকারের সামনে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তিনি বলেন, দেশে এ মুহূর্তে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ মজুত রয়েছে। কৃষকের হাতে এখনো এক লাখ ২০ হাজার টন পুরোনো পেঁয়াজ রয়েছে। এছাড়া বাজারে ইতোমধ্যে নতুন পেঁয়াজ উঠতে শুরু করেছে। চলতি মাসেই আরও প্রায় আড়াই লাখ টন নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফলে আমদানির কোনো সুযোগ থাকলেও সিন্ডিকেট এখন সুবিধা করতে পারবে না।
দেশে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ উৎপাদনের পরও কেন আমদানির প্রয়োজন পড়ে—এমন প্রশ্নে ড. জামাল উদ্দীন বলেন, সিন্ডিকেটের কারসাজি ও বাজার নিয়ন্ত্রণের কারণে সরকার বাধ্য হয় আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে। অথচ বাস্তবতা হলো, উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশ পেঁয়াজে স্বাবলম্বী। কৃষকদের সংরক্ষণ ক্ষমতা বাড়াতে সরকার সম্প্রতি ৪ হাজার হাই-ফ্লো মেশিন বিতরণ করেছে, আর বেসরকারিভাবে আরও ১৫ হাজার মেশিন ব্যবহৃত হচ্ছে। আগামী বছর মোট ৩০ হাজার হাই-ফ্লো মেশিন দিয়ে কৃষকরা তিন লাখ ৬০ হাজার টন পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে পারবেন, যা বছরের শেষ দিকে কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ কমিয়ে দেবে।
কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২৮ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে গত মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে ৪৪ লাখ টন। তবুও সিন্ডিকেটের কারণে গত বছর চার লাখ টনের বেশি এবং এর আগের বছর সাড়ে সাত লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়েছে। এ কারণে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা ও সিন্ডিকেটবিরোধী শক্তিশালী আইন প্রয়োগ জরুরি হয়ে পড়েছে।
বর্তমান দরপতন সাধারণ মানুষকে যেমন স্বস্তি দিয়েছে, তেমনি সরকারকেও বাজার নিয়ন্ত্রণে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। পেঁয়াজ সংকটকে কেন্দ্র করে দেশে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল তা এবারও একইভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারত, যদি সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিত। ক্রেতারা এখন অপেক্ষা করছেন দাম আরও কমে স্থিতিশীল হওয়া পর্যন্ত। আর বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিন্ডিকেট ভাঙতে সক্ষম হলে পেঁয়াজের বাজারে স্থায়ী স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।