প্রকাশ: ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের উপকূলীয় নোয়াখালী জেলার দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া বহু দশক ধরে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে নিরাপদ স্থলপথে যুক্ত হতে পারেনি। মাত্র নৌ‑যোগে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার ছিল মানুষের একমাত্র ভরসা। পথের অবস্থা, জোয়ার-ভাটার পরিবর্তন, নদীর শিলা ও বালিময় শোল—সব মিলিয়ে যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের জন্য ছিল এক দীর্ঘ যন্ত্রণার প্রতীক্ষা। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে হাতে-কলমে কাজ এগিয়ে যাওয়ার ফলে এবার সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষ হতে যাচ্ছে। হাতিয়া — নলচিরা ও চেয়ারম্যান ঘাটের মধ্যে ফেরি চালুর প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে, আর দ্বীপবাসীর মুখে ফুটেছে নতুন আশা।
নৌপরিবহন উপদেষ্টা বাংলাদেশ ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট অথরিটি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এএসএম আশ্রাফুজ্জামান বলছেন, চলতি সময় তারা দু’পাড়ে লো‑ওয়াটার ও মিড‑ওয়াটার চারটি রোড নির্মাণ করছেন, যাতে জোয়ার-ভাটার সময়েও ফেরি থেকে গাড়ি উঠা‑নামা করা যায়। জেটি, যাত্রী ছাউনি, ঘাট এবং সংযোগ সড়কসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। অনুমোদন পেলে এই কাজও দ্রুত শুরু হবে।
হাতিয়া উপজেলা, যার বাস্তব জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে সাত লাখ, ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। এই দ্বীপে বাসিন্দারা সবসময়ই মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে দারুণ যোগাযোগ সংকটের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করেছেন। নদী পারাপারের সময় ছিল ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তায় লিপ্ত। পুরনো সি‑ট্রাক প্রায়ই বিকল হয়ে যেত, ছোট ট্রলার বা স্পিডবোটে যাত্রীরা ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতেন। মালের পরিবহনে ছিল বাধা, এবং ঝড় বা জোয়ারের সময় নৌ চলাচল বন্ধ থাকলে দ্বীপ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ত। এই বাস্তবতা শত শত দুর্ঘটনার কারণও হয়েছে।
নতুন ফেরি চালু হলে সবকিছু বদলে যাবে। প্রথম থেকেই যাত্রী, মালবাহী ট্রাক, ব্যবসায়ি, পণ্যপ্রেরক—সবাই উপকৃত হবেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, ফেরি চালু হলে তাদের মালামাল কম খরচে সম্মিলিতভাবে নিয়ে আসা যাবে। আর ব্যয় সাশ্রয়ী হবে, নিরাপদ হবে আর ঝুঁকিমুক্তও। জলপথে মালামাল নিয়ে আসলে দোকান-গুদামের সামনে থেকে সরবরাহ সম্ভব হবে, যা ভুচরা পরিবহনের ঝামেলা, সময় এবং খরচ কমাবে।
উদাহরণস্বরূপ, হাতিয়া নিউমার্কেট এলাকার ব্যবসায়ী আশিক ইকবাল জানিয়েছেন, অতীতে ট্রলারে ঝুঁকি নিয়ে পণ্য আনতেন। কখনো ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটত। এখন ফেরি চালু হলে সেই ঝুঁকি থাকবে না, পণ্য‑পরিবহন সহজ এবং নিরাপদ হবে। ভোক্তারাও সস্তায় পণ্য পাবে, ক্রেতার ভোগান্তি কমবে।
একইভাবে সাধারণ বাসিন্দারা বলছেন, ফেরির অপেক্ষা ছিল তাদের দিনের পর দিন। গর্ভবতী মা, রোগী, শিক্ষার্থী, এমনকি সংকটাপন্ন সময়ে জরুরি প্রয়োজনে মানুষ কখনো কখনো নিঃশর্ত ঝুঁকি নিয়েও যাত্রা করতেন। কোনো ধরনের দুর্ঘটনা বা আবহাওয়া-বিপর্যয়ের সময় নৌ যোগাযোগ বন্ধ না হলে পরিবারগুলো একেবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ত। কিন্তু ফেরি চালু হলে এমন ঝুঁকি কমবে।
২০২৫-এর ২৮ অক্টোবর, নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন এক আলোচনা সভায় ঘোষণা করেছিলেন, “শিগগিরই হাতিয়ার নলচিরা‑চেয়ারম্যান ঘাট রুটে ফেরি চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং আমি চাই, আমি থাকতেই এ ফেরি যেন উদ্বোধন করতে পারি।” এ কথা জানিয়ে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা দ্বীপবাসীর মধ্যেও নতুন প্রাণ জাগিয়েছে।
হাতিয়ার মানুষের জন্য এই ফেরি শুধু একটি যাতায়াতের মাধ্যম নয়; এটি একটি নতুন জীবনের সূচনা। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রাণনিরাপত্তার দিক থেকে এটি একটি বিপুল পরিবর্তন। নতুন ঘাট, উন্নত সড়ক, নিরাপদ যাতায়াত—সব মিলিয়ে দ্বীপ এখন সে স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে যা বহু বছর ধরে ছিল শুধু আকাঙ্খা।
কিন্তু প্রত্যাশার সঙ্গে সঙ্গে রয়েছে কিছু অনিশ্চয়তাও। নদীর বুকে, বিশেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জোয়ার-ভাটার ওঠানামা, জলবাহিত ভূগোলের জটিলতা—এসব বিষয় এখনও রয়েছে। ইতিহাস গাঁথা হাতিয়ায় বহুবার দেখা গেছে নদীর অস্বাভাবিক গতিপথ, লুকানো শোল, জলদুর্যোগ। একবারে স্থায়ী সমাধান না হলেও, নিয়মিত রূপায়ণ এবং নদী-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।
দ্বীপবাসীর মতে, ফেরি চালু হলে শুধুই আর্থিক লাভ বা যাতায়াত সহজতা নয়, পরিবর্তন আসবে তাদের জীবনধারায়। শিশুদের স্কুলে যাওয়া সহজ হবে। রোগী সহজে চিকিৎসা কেন্দ্রে যেতে পারবে। জরুরি সময়ে নদীর দোলনা বা ঝড়-তুফানে হয়তো স্পিডবোট বন্ধ থাকলেও ফেরি চলাচল বা দ্রুত উদ্ধার সম্ভব হবে।
অনেকেই বলছেন, এটি হবে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী — সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, যোগাযোগ ব্যবস্থাও বদলাতে হবে। হাতিয়া আজ সেই পরিবর্তনের মুখে দাঁড়িয়েছে।
যে দিন ঘাটে প্রথম ফেরি ডেকে নাটকীয়ভাবে জলধারায় ছুটবে, সেটি হবে দশকের স্বপ্নের বাস্তব। এবং সেই দিনের অপেক্ষায় এখন হাতিয়া।