প্রকাশ: ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগ নেয়ার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। এই বিশেষ ব্যবস্থায় ঋণগ্রহীতারা মাত্র দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ১০ বছরের জন্য তাদের খেলাপি ঋণ পুনর্গঠন করতে পারছেন। এ সুযোগ নেওয়ার জন্য এখন পর্যন্ত এক হাজার ৫১৬টি আবেদন জমা পড়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে ৩০০ গ্রুপের ৯০০টি আবেদন চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের প্রতিবেদনে এই তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। গত রোববার ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকার্স সভায় এই প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। সভায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ব্যাংকগুলোকে দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।
প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, খেলাপি ঋণের অবাঞ্ছিত বৃদ্ধি রোধ করতে গত বছরের জানুয়ারিতে এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে কোনো নীতিমালা না থাকায় একটি পাঁচ সদস্যের কমিটির মাধ্যমে আবেদন আহ্বান করা হয়েছিল। কমিটি দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্ট ও দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ থেকে ১৫ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় অভিযোগ উঠে যে, অনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ আমলের কিছু সুবিধাভোগীর নামও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই সমালোচনার পর সম্প্রতি একটি সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক এই বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করেছে।
সেপ্টেম্বরের সার্কুলার অনুযায়ী, জুন পর্যন্ত খেলাপি হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো এই সুবিধার জন্য আবেদন করতে পারবে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো দুই শতাংশ অর্থ জমা দিয়ে ঋণ নিয়মিত করতে পারবে। ঋণ নিয়মিত করলে প্রথম দুই বছর ঋণ পরিশোধে বিরতি সুবিধা থাকবে। পরে নভেম্বরে আরেকটি সার্কুলার জারি করে বলা হয়, ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ঋণের জন্য আবেদন করা যাবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক হাজার ৫১৬টি আবেদনের মাধ্যমে এক লাখ ৯৬ হাজার ৪৭ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য আবেদন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০০টি গ্রুপের ৯০০টি আবেদন চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। ব্যাংকগুলো ইতোমধ্যেই ২৫০টি ঋণ আবেদন বাস্তবায়ন করেছে, যার মধ্যে মোট ২৬ হাজার ১১৪ কোটি টাকার ঋণ কার্যকর হয়েছে।
তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যাংকগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি আশানুরূপ নয়। খেলাপি ঋণের হার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় সমগ্র ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নতুন চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত বিভিন্ন কারণে বহু ঋণগ্রহীতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাদের ঋণ পরিশোধে সুবিধা দিয়ে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
নীতিসহায়তা দ্রুত কার্যকর হলে খেলাপি ঋণের হার কমবে এবং ঋণ আদায়ও ত্বরান্বিত হবে। এতে একদিকে ব্যাংকিং খাতে তারল্য চাপ কমবে, অন্যদিকে ব্যবসায় পরিচালনার পরিবেশ আরও স্থিতিশীল হবে। তাই দেশের অর্থনীতির প্রবাহ সচল রাখা এবং খেলাপি ঋণ সহনীয় মাত্রায় নামানোর স্বার্থে বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে দ্রুত কার্যকর করার নির্দেশনা দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ কেবল ঋণগ্রহীতাদের সহায়তা করবে না, বরং সমগ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করার মাধ্যমে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল প্রক্রিয়া সফল হবে, যা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যিক পরিবেশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।