মোহাম্মদপুরে বাসা থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় মা–মেয়ের লাশ উদ্ধার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬৫ বার

প্রকাশ: ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

মোহাম্মদপুরে মা–মেয়ের লাশ উদ্ধার রাজধানীর মানুষের মনে নতুন আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে, কারণ ঘটনাটি রহস্যজনক পরিস্থিতিতে ঘটেছে এবং পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে নৃশংসতার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সোমবার দুপুরে মোহাম্মদপুর এলাকার একটি আবাসিক ফ্ল্যাট থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় লায়লা আফরোজ (৪৮) ও তাঁর কিশোরী মেয়ে নাফিসা নাওয়াল বিনতে আজিজের (১৫) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শোক ও শঙ্কার মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

নিহত নাফিসা রাজধানীর প্রিপারেটরি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী। মেধাবী এবং শান্ত স্বভাবের হিসেবে পরিচিত ছিল মেয়েটি। নাফিসার বাবা আজিজুল ইসলাম পলাশ রাজধানীর একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। প্রতিদিনের মতো আজও তিনি সকালে স্কুলে গিয়েছিলেন। কিন্তু সাড়ে ১১টার দিকে বাসায় ফিরে যে দৃশ্য তিনি দেখেন, তা জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ মুহূর্ত হয়ে ওঠে। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ফ্ল্যাটের দরজা বাইরে থেকে খোলাই ছিল, যা তাঁর সন্দেহের সৃষ্টি করে। ভেতরে ঢুকেই তিনি দেখতে পান ঘরের মেঝে রক্তে ভেজা।

সবচেয়ে আগে চোখে পড়ে মেয়ের রক্তাক্ত দেহ। ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকা নাফিসার নিথর দেহ দেখে তিনি মুহূর্তেই দিশেহারা হয়ে পড়েন। এরপর তিনি দৌড়ে রান্নাঘরের দিকে যান, যেখানে আরও ভয়াবহ দৃশ্য অপেক্ষা করছিল। সেখানে পড়ে ছিলেন তাঁর স্ত্রী লায়লা আফরোজ, তিনিও রক্তাক্ত অবস্থায় নিথর। মুহূর্তেই তিনি চিৎকার করে প্রতিবেশীদের ডাকেন, এবং দ্রুত খবর দেওয়া হয় পুলিশকে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পরিবারটি শান্ত–স্বভাবের এবং কোনো ধরনের সামাজিক বিরোধ বা পারিবারিক অস্থিরতার খবর তাঁরা কখনো পাননি। ফলে ঘটনাটি তাদের কাছেও রহস্যময় মনে হচ্ছে। সকালবেলা বাসায় কাজ করেন এমন একজন গৃহকর্মী প্রতিদিনের মতো আসে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পরিবার ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গৃহকর্মী কাজ করতে আসেন প্রতিবছর সকাল ৯টার দিকে। কিন্তু সোমবার সকালে তিনি আদৌ উপস্থিত ছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হতে পুলিশ তাঁকে খুঁজছে।

মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেজবাহ উদ্দিন ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত কার্যক্রম তদারকি করেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, নিহত মা–মেয়ের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে এবং প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তাঁদের ওপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। তবে কারা, কী উদ্দেশ্যে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি। তদন্তের স্বার্থে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য থেকে বিরত থাকলেও বলেন, “আমরা সবকিছু খতিয়ে দেখছি—পারিবারিক সম্পর্ক, আর্থিক লেনদেন, গৃহকর্মীর উপস্থিতি, বাসায় কোনো অনুপ্রবেশের চিহ্ন আছে কি না—সবকিছুই অনুসন্ধান করা হচ্ছে।”

পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে কিছু আলামত সংগ্রহ করেছে। ঘর এলোমেলো ছিল কি না বা কোনো মূল্যবান সামগ্রী হারিয়েছে কি না, সেটাও তদন্তের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে প্রাথমিকভাবে বাসার ভেতরে জোরপূর্বক প্রবেশের তেমন কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে।

এদিকে আজিজুল ইসলামের সহকর্মী ও প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, পরিবারটি সামাজিকভাবে সক্রিয় ও শান্তিপ্রিয়। লায়লা আফরোজ পরিবার–কেন্দ্রিক জীবনযাপন করতেন এবং মেয়ের পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। স্কুলের শিক্ষকরা নাফিসার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তাঁরা বলেন, পড়ালেখায় মনোযোগী এবং অত্যন্ত ভদ্র মেয়ে ছিল নাফিসা। এমন নির্মম হত্যাকাণ্ড তাঁদেরও ভাবিয়ে তুলেছে।

মা–মেয়ের মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে ময়নাতদন্তের জন্য। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর ধরন, আঘাতের প্রকৃতি ও সম্ভাব্য হত্যার সময় সম্পর্কে আরও পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যাবে বলে ধারণা করছে পুলিশ। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরাও বাসা থেকে রক্ত, চুল, আঙুলের ছাপসহ বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করছেন।

ঘটনার পর থেকেই পুরো এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেশীরা গভীর শোকের পাশাপাশি আতঙ্ক প্রকাশ করেছেন। অনেকেই বলছেন, ঢাকায় দিনেদিনে চুরি, হত্যা ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে, যা বাসিন্দাদের নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে আবাসিক এলাকায় এ ধরনের হত্যাকাণ্ড তাঁদের হতবাক করেছে।

আজিজুল ইসলাম বর্তমানে চরম মানসিক আঘাতের মধ্যে আছেন। একসঙ্গে স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ দেখার এই নির্মম অভিজ্ঞতা তিনি সহ্য করতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। কথা বলার মতো অবস্থায়ও তিনি নেই। স্বজনরা তাঁর পাশে আছেন, কিন্তু তাঁকে কোনোভাবেই সান্ত্বনা দেওয়া যাচ্ছে না।

তদন্ত–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই হত্যাকাণ্ড কোনো পরিকল্পিত ঘটনার অংশ হতে পারে। আবার পারিবারিক পরিচিত কেউ জড়িত থাকতে পারে—এ সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তদন্তকারীরা নিহত লায়লা আফরোজের ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা, কল রেকর্ড, সিসিটিভি ফুটেজ—সবই বিশ্লেষণ করছেন। পুরো বাসায় কোনো সিসিটিভি ছিল না, তবে ভবনের সাধারণ এলাকাগুলোর ক্যামেরা ফুটেজ সংগ্রহ করে তা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

মোহাম্মদপুর এলাকার এই মা–মেয়ের নির্মম হত্যাকাণ্ড রাজধানীতে আরও একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—মানুষ আসলে কতটা নিরাপদ তাদের নিজ ঘরে? তদন্ত সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত রহস্য আরও গভীর হচ্ছে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, খুব শিগগিরই ঘটনাটির রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব হবে।

মা–মেয়ের এই মৃত্যু শুধু এক পরিবারেরই নয়, বরং পুরো সমাজের জন্য এক বেদনাবিধুর দুঃসংবাদ হয়ে এসেছে। পরিবারের আত্মীয়স্বজন ও এলাকার মানুষ আশা করছেন, দ্রুতই দোষীদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত