প্রকাশ: ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
জেলেনস্কি শান্তি প্রস্তাব প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বিস্ফোরক মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। তিনি দাবি করেছেন, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবটি নাকি এখনও পড়েই দেখেননি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। রোববার (৭ ডিসেম্বর) রাতে ওয়াশিংটন ডিসির কেনেডি সেন্টারে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই দাবি করেন। উত্তপ্ত যুদ্ধক্ষেত্রের প্রেক্ষাপটে এবং মার্কিন নেতৃত্বাধীন শান্তি প্রচেষ্টার মাঝে ট্রাম্পের এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অনিশ্চয়তার ছায়া ফেলেছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যের পরপরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে প্রশ্ন—ইউক্রেনের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব আসলেই কি শান্তি প্রস্তাবটি পড়েনি, নাকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে কূটনৈতিক সমন্বয়ে নতুন কোনো টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে? যুদ্ধের চতুর্থ বর্ষে এসে এই ধরনের মন্তব্য নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে।
ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, তার প্রশাসন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইউক্রেনীয় শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। তিনি বলেন, “আমরা প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে কথা বলেছি, আমরা জেলেনস্কি এবং ইউক্রেনীয় নেতাদের সঙ্গেও কথা বলেছি। তবে আমি কিছুটা হতাশ, কারণ জেলেনস্কি এখনও সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবটি পড়েননি। অবশ্য এটি কয়েক ঘণ্টা আগের ঘটনা, তাই হয়তো তিনি পরে সময় নিতে পারেন।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের গুরুত্ব বেড়ে যায় আরও বেশি, কারণ তার একদিন আগেই ইউক্রেনের জন্য ট্রাম্পের বিশেষ দূত কিথ কেলগ দাবি করেছিলেন—রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি “খুব কাছাকাছি অবস্থায়” রয়েছে। এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে আশাবাদের সঞ্চার করলেও, ট্রাম্পের সর্বশেষ বক্তব্য পরিস্থিতিকে আবারও এক অদ্ভুত ধোঁয়াশার দিকে নিয়ে গেছে।
যুদ্ধের ভয়াবহতা ইতোমধ্যেই ইউক্রেনের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও মানবিক পরিস্থিতিকে জর্জরিত করেছে। লাখ লাখ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সংকট এখনও তীব্র। এমন পরিস্থিতিতে একটি কার্যকর শান্তি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবে—এটাই ছিল বিশ্বের প্রত্যাশা। যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির উদ্যোগে যখন একটি প্রস্তাব তৈরি হলো, তখন সেটি ইউক্রেনীয় নেতৃত্ব দ্বারা অবিলম্বে পর্যালোচনা করা স্বাভাবিক বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। ফলে ট্রাম্পের মন্তব্য শুধু বিস্ময়ই নয়, বরং সন্দেহও সৃষ্টি করেছে—ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কি সত্যিই এই আলোচনায় যথেষ্ট সাড়া দিচ্ছে? নাকি এখানে কূটনৈতিক কৌশলের আরও গভীর স্তর রয়েছে?
ইউক্রেনের তরফ থেকে ট্রাম্পের মন্তব্যের ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনো জানা যায়নি। তবে ইউক্রেনীয় কূটনৈতিক সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, জেলেনস্কি প্রস্তাবটি হাতে পেয়েছেন কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়। তাদের বক্তব্য—শান্তি প্রস্তাবটি যদি একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো হয়ে থাকে, তবে তা পর্যালোচনা করতে সময় লাগতেই পারে। ইউক্রেনের পক্ষে যেকোনো চুক্তির আগে যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং দখলীকৃত অঞ্চলগুলোর ভবিষ্যৎ—এই তিনটি প্রশ্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে জেলেনস্কি সোমবার লন্ডনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এই বৈঠক ঘিরেও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, কারণ ধারণা করা হচ্ছে—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত সর্বশেষ শান্তি পরিকল্পনাই সেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। ইউক্রেনের প্রধান ইউরোপীয় মিত্ররা যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বিত কোনো অবস্থান নেয়, তবে শান্তি প্রক্রিয়া দ্রুত অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
ইউরোপীয় নেতাদের এই বৈঠক আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মানবিক সংকট মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এই জোট একমত হয় যে যুদ্ধ অবসানই এখন সবচেয়ে জরুরি বাস্তবতা, তবে রাশিয়া এবং ইউক্রেন উভয়ের ওপরই নতুন ধরনের চাপ সৃষ্টি হবে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে যায়—জেলেনস্কি কি মার্কিন সমর্থিত শান্তি পরিকল্পনায় আগ্রহী? ইউক্রেনের নীতিনির্ধারণী মহলে একটি মত শক্তিশালী—যে কোনো যুদ্ধবিরতির আগে রাশিয়াকে দখলীকৃত অঞ্চলগুলো থেকে সরে যেতে হবে। অন্যদিকে রাশিয়া বলছে, বাস্তবতার ভিত্তিতে শান্তি প্রক্রিয়া চলতে হবে, যেখানে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করাই হবে মূল লক্ষ্য। এই দুপক্ষের অবস্থানই বর্তমানে সবচেয়ে বড় বাধা।
ট্রাম্পের মন্তব্য কিছু বিশেষজ্ঞের ব্যাখ্যায় রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। মার্কিন প্রশাসন যুদ্ধ শেষ করতে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে, কারণ দীর্ঘায়িত সংঘর্ষ মার্কিন অর্থনীতি, সামরিক সহযোগিতা এবং ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলছে। ফলে ট্রাম্পের এই প্রকাশ্য মন্তব্য ইউক্রেনকে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে উৎসাহিত অথবা বাধ্য করার কৌশলও হতে পারে।
অন্যদিকে, ইউক্রেনের অভ্যন্তরে যুদ্ধ অব্যাহত রাখার পক্ষে এবং শান্তি আলোচনায় প্রবেশের পক্ষে—দুই ধরনের শক্তিই সক্রিয়। দেশের জনগণ যুদ্ধের ক্লান্তিতে বিধ্বস্ত, পুনর্গঠনের চাপ বাড়ছে, কিন্তু একইসঙ্গে সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নেও আপস করতে চায় না কেউ। এই দ্বিধাবিভক্ত বাস্তবতায় জেলেনস্কির অবস্থান নিঃসন্দেহে জটিল।
যুদ্ধক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাশিয়ার অগ্রগতি আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। অবকাঠামো ধ্বংস, বিদ্যুৎকেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় তীব্র সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তুলেছে। এই বাস্তবতায় যদি কোনো শান্তি প্রস্তাব সত্যিই আলোচনার জন্য প্রস্তুত থাকে, তাহলে তা ইউক্রেনের ভবিষ্যৎকে নতুন ধারায় নিয়ে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের মন্তব্য শুধু কূটনৈতিক অস্বস্তিই তৈরি করেনি, বরং রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র যে যুদ্ধের দ্রুত অবসান চায়, তা স্পষ্ট। ইউরোপীয় মিত্ররাও এখন আগের তুলনায় বেশি সক্রিয়। এখন দেখার বিষয়—জেলেনস্কি প্রশাসন ঠিক কোন পথ বেছে নেয় এবং মার্কিন সমর্থিত শান্তি প্রস্তাবটি ইউক্রেনের জন্য শেষ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য হয় কি না।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের সংঘর্ষে বিশ্ব যে দীর্ঘদিন ধরে নিরন্তর রক্তক্ষয়ী বাস্তবতার সাক্ষী, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এই মুহূর্তে শান্তির সম্ভাবনা যতটুকুই হোক, তার মূল্য অসীম। কারণ প্রতিটি দিন, প্রতিটি ক্ষণ এই যুদ্ধ নতুন করে ধ্বংস, মৃত্যু এবং অগণিত পরিবারের অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী ভয়াবহতা থেকে মুক্তির পথ খুঁজে পাওয়া এখন পৃথিবীর সকল শান্তিপ্রিয় দেশের অগ্রাধিকার। জেলেনস্কি শান্তি প্রস্তাবটি পড়েছেন কি না, তা যতই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হোক না কেন—যুদ্ধের অবসানের জন্য দ্রুত, সুচিন্তিত এবং মানবিক সিদ্ধান্তই এখন সময়ের দাবি।