প্রকাশ: ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বৈদেশিক ঋণের চাপ দিন দিন বাড়ছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক পরিস্থিতি, বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি, ডলারের সংকট এবং উন্নয়ন প্রকল্পের বিস্তার—সব মিলিয়ে গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪২ শতাংশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সুদ-আসল পরিশোধের ওপর বাড়তি চাপ, যা একই সময়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের নতুন ইন্টারন্যাশনাল ডেট রিপোর্ট ২০২৫–এ উঠে এসেছে এমন তথ্য, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সামনে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
রবিবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সাল শেষে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৪৪৮ কোটি ডলারে। পাঁচ বছর আগে, অর্থাৎ ২০২০ সালে এই পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৩৫৫ কোটি ডলার। শুধু তাই নয়, সরকার ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে যে বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হয়েছে, তার সুদ ও আসল পরিশোধেও চাপ ব্যাপক হারে বেড়েছে। ২০২০ সালে যেখানে ৩৭৩ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হয়েছিল, ২০২৪ সালে সেই অঙ্ক দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৩৫ কোটি ডলারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এসব উন্নয়ন প্রকল্পের ভূমিকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল, তৃতীয় টার্মিনাল, অকশন রোড টানেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, সেতু–এমন অনেক বড় প্রকল্পেরই উল্লেখযোগ্য অংশ বৈদেশিক অর্থায়নে গড়ে উঠেছে। এসব প্রকল্প দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগ সম্ভাবনা বাড়াতে অবদান রাখছে। কিন্তু উন্নয়ন ব্যয়ের দ্রুত বৃদ্ধি ও প্রকল্পভিত্তিক বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির কারণও হয়ে দাঁড়াতে পারে—বিশেষজ্ঞদের এমন সতর্কতা এই প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে বৈদেশিক ঋণ নেওয়া সহজ ও সাশ্রয়ী হওয়ায় অনেক দেশ বৃদ্ধি-চালিত মডেল অনুসরণ করেছে। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ডলারের দাম বৃদ্ধি এবং সুদের হার বাড়ার ফলে এসব ঋণের প্রকৃত চাপ পূর্বের তুলনায় বহুগুণ বেড়ে গেছে। বাংলাদেশের অবস্থানও এই চাপে থাকা দেশগুলোর তালিকায় যুক্ত হয়েছে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য কয়েকটি দেশের সঙ্গে।
তবে আশার বিষয়, ঋণ ছাড়ের ক্ষেত্রে খুব বেশি জটিলতায় পড়েনি বাংলাদেশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সরকারি-বেসরকারি খাতে ঋণ ছাড়ের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ১১০ কোটি ডলার, যা ২০২০ সালে ছিল ১ হাজার ২২ কোটি ডলারের কাছাকাছি। অর্থাৎ ঋণ ছাড়ের পরিমাণ বাড়লেও তা খুব বেশি নয়। কিন্তু যে ঋণটা এসেছে তার পরিশোধের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অর্থনৈতিক সুরক্ষার জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু ঋণের পরিমাণ বেড়েছে তা নয়, মূল সমস্যা হলো ডলারের বিপরীতে টাকার মানহানি। গত কয়েক বছরে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বেড়েছে ব্যাপকভাবে। ফলে ঋণ পরিশোধে একই অঙ্কের ডলার পরিশোধ করতে এখন আগের তুলনায় বেশি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বাজেট ঘাটতি বেড়ে চলেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও নিয়মিত চাপে রয়েছে।
ট্রেস কনসালটিংয়ের সিইও ফুয়াদ এম খালিদ হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেছেন, বৈদেশিক ঋণের বাড়তি চাপ মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ডলারের ওপর চাপ কমানো। তার মতে, রফতানি আয় বৃদ্ধি ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ স্থিতিশীল রাখা ছাড়া এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠার কোনো বিকল্প নেই। রেমিট্যান্স বা রফতানি আয় যেহেতু সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ায়, তাই এই দুটি খাতকে শক্তিশালী করতেই হবে। তিনি মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি দুই-এক মাসে সমাধান করা সম্ভব নয়; বরং এর জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং সুসংগঠিত নীতি গ্রহণ করতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের ঋণ পরিস্থিতির উন্নতির জন্য তিনটি প্রধান বিষয়ে লক্ষ্য রাখা জরুরি। প্রথমত, উচ্চ সুদের বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং সস্তা ঋণপথের সন্ধান করা। দ্বিতীয়ত, বড় প্রকল্পগুলোতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা, যাতে অপ্রয়োজনীয় সুদ ও ব্যয় বাড়তে না পারে। তৃতীয়ত, রফতানি খাত ও রেমিট্যান্স প্রবাহকে আরও গতিশীল করে বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় বাড়ানো।
বাংলাদেশের রফতানি এখনো প্রধানত পোশাক খাতনির্ভর। কিন্তু বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে এবং উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে রফতানি বৈচিত্র্য আনাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। একইভাবে রেমিট্যান্স প্রবাহেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওঠানামা দেখা গেছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে শ্রমবাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য সরকারি পর্যায়ে আরও কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।
অন্যদিকে, বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধি সত্ত্বেও ঋণ ছাড়ের হার খুব বেশি না বাড়া কিছু বিশেষজ্ঞকে উদ্বিগ্ন করেছে। তাদের মতে, ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়লেও বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পের সংখ্যা বাড়েনি। ফলে স্থবির প্রকল্প কিংবা ব্যয়বহুল প্রকল্প ব্যবস্থাপনাও অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে অধিক ব্যয়ে বিদেশি পরামর্শক, প্রযুক্তি ও সেবার ওপর নির্ভরতা বাড়ায় প্রকল্প খরচ একাধিক ক্ষেত্রে অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, ডলারের অস্থিরতা এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও চাপে রয়েছে। এসব পরিস্থিতির মাঝে বৈদেশিক ঋণের বৃদ্ধি আরও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। তবে সরকার বলছে, উন্নয়ন ব্যয়ের বর্তমান ধারা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে আগামী দশকে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো শক্তিশালী হবে এবং উৎপাদন ও রফতানি ভিত্তি আরও প্রসারিত হবে। বৈদেশিক বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনাও রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কিছুটা স্থিতিশীলতা এনে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আজকের বৈদেশিক ঋণের চাপ দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন ধারার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। কাজেই আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক মুদ্রানীতি আরও সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে।
বাংলাদেশ যে এখন এক শতাধিক বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের পর্যায়ে, তার অর্থনৈতিক সুফল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও স্পষ্ট হবে। তবে বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা ও পরিশোধ চ্যালেঞ্জ এখনই মোকাবিলা করতে না পারলে তা দেশের সমগ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে চাপের মুখে ফেলতে পারে। সামনে বিশ্ব অর্থনীতি যে অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে, সেই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের জন্য এটি হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।