প্রকাশ: ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রবাসীদের সম্পর্কে নানা সময়ে বিভিন্ন গুজব ও অপপ্রচার ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। বিশেষ করে বিদেশফেরত কর্মীদের ক্ষেত্রে এমন বিভ্রান্তিকর তথ্য তাদের মানসিক অস্থিরতা তৈরি করে এবং অনেকে না জেনে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে উদ্বেগে পড়ে যান। এই পরিস্থিতিতে সরকার যে নতুন কোনো কঠোর নিয়ম করেনি, বরং প্রবাসীদের সুবিধা আরও বাড়ানো হয়েছে—তা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। তিনি সামগ্রিক বিষয়টি ব্যাখ্যা করে প্রবাসীদের প্রতি গুজবে কান না দেওয়ার অনুরোধ করেছেন।
সোমবার নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে দেওয়া একটি পোস্টে ড. আসিফ নজরুল লেখেন, বিদেশ থেকে একাধিক মোবাইল আনলে ট্যাক্স দিতে হবে—এই ধরনের প্রচারণা নতুন কোনো আইন নয়। বহু বছর ধরে এমন নিয়মই প্রচলিত ছিল। বরং বর্তমান সরকার প্রবাসীদের সুবিধা আরও বাড়িয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, শেখ হাসিনার সময়ে প্রবাসী শ্রমিকরা দেশে ফেরার সময় নিজের ব্যবহারের মোবাইল সেটের বাইরে মাত্র একটি নতুন ফোন আনতে পারতেন। কিন্তু বর্তমান সরকার ব্যাগেজ রুল সংশোধন করে সেই সুবিধা বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন প্রবাসীরা নিজের ব্যবহারের মোবাইলের সঙ্গে আরও দুইটি নতুন ফোন আনতে পারবেন। অর্থাৎ মোট তিনটি ফোন দেশে আনা যাবে কোনো কর ছাড়াই। তবে এর বেশি আনতে চাইলে অতিরিক্ত সেটের জন্য ট্যাক্স দিতে হবে, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশেও প্রচলিত।
উপদেষ্টা আরও জানান, এটি কেবল বিএমইটি অনুমোদিত প্রবাসীদের জন্য প্রযোজ্য হবে। যারা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র নিয়ে বিদেশে গেছেন তারাই এই সুযোগটি পাবেন। অন্যদের ক্ষেত্রে আগের নিয়মই বহাল থাকবে। কিন্তু কিছু ব্যক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন পেজে বিষয়টি অন্যভাবে উপস্থাপন করে প্রবাসীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলছে। তিনি এমন অপপ্রচারে কান না দিয়ে সঠিক তথ্য জেনে চলার আহ্বান জানান।
সম্প্রতি আরেকটি গুজব ছড়ানো হয়, বিদেশে থাকা প্রবাসীরা দেশে এলে মাত্র ৬০ দিন থাকার সুযোগ পাবেন। বিষয়টি পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেন উপদেষ্টা। তিনি জানান, ফোন রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত নতুন নিয়মকে ভুল ব্যাখ্যা করে কিছু মানুষ এ ধরনের বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, যা শুধুমাত্র গুজবই নয়, সমাজে আতঙ্ক তৈরির অপচেষ্টা। নতুন আইন অনুযায়ী, আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে যে কোনো ব্যক্তি দেশে নতুন মোবাইল সেট ব্যবহার শুরু করলে ৬০ দিনের মধ্যে সেটটি নিবন্ধন করতে হবে। এটি প্রবাসীদের জন্য আলাদা কোনো নিয়ম নয়, বরং দেশের প্রত্যেক নাগরিকের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। তিনি বলেন, দেশের নিরাপত্তা সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং অবৈধ মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধ করতে এই নিবন্ধন ব্যবস্থা জরুরি হয়ে পড়েছে। অপহরণ, হুমকি, চাঁদাবাজি, মানবপাচার বা অনলাইন জুয়ার মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সেটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন তিনি।
ড. আসিফ নজরুল বলেন, আইন কারও হয়রানির জন্য নয়, বরং নিজের নিরাপত্তার জন্যই করা হয়। কিন্তু প্রতিবারই দেখা যায়, কোনো নতুন নীতি বা বিধান জারি হলেই কিছু ব্যক্তি তা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিকৃত তথ্য ছড়িয়ে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ায়। তিনি সতর্ক করে বলেন, গুজব রটানো বা গিবত ছড়ানো ইসলামের দৃষ্টিতে বড় পাপ। তাই কেউ যখন তথ্য বিকৃত করে প্রচার করে, তখন তা শুধু সামাজিক ক্ষতি করে না, ধর্মীয় দিক থেকেও গুরুতর অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি প্রবাসীদের উদ্দেশে বলেন, দেশের আইন ও সরকারি সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কোনো সন্দেহ হলে অফিসিয়াল সোর্স থেকে তথ্য যাচাই করে নিন, কারও মিথ্যা কথায় বিশ্বাস করবেন না।
প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ। বছরে প্রায় তিন কোটির বেশি মানুষ দেশের বাইরে কর্মরত আছেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বড় উৎস। তাই প্রবাসীদের সুরক্ষা, সুবিধা এবং তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু যখন বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়, তখন তা শুধু প্রবাসীদের নয়, দেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সরকার প্রবাসীদের জন্য আরও সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন উপদেষ্টা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যারা বিদেশে গিয়ে কঠোর পরিশ্রম করেন তাদের প্রতি সম্মান ও দায়িত্ব সরকারের রয়েছে। তাই নতুন নিয়মগুলো প্রবাসীবান্ধব এবং স্বচ্ছভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে।
এদিকে প্রবাসী সম্প্রদায়ের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মন্তব্য করেছেন যে, উপদেষ্টার ব্যাখ্যা তাদের বিভ্রান্তির অবসান ঘটিয়েছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গুজবে পড়ে অসহায় বোধ করছিলেন। বিশেষ করে ফোন রেজিস্ট্রেশন আইন ও মোবাইল আনার নিয়ম নিয়ে নানা অপপ্রচার বহু প্রবাসীর মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল। সরকারিভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করায় তারা এখন নিশ্চিত হয়েছেন কোনটা সত্য এবং কোনটা গুজব।
সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে গৃহীত এসব পদক্ষেপ প্রবাসীদের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। পরিবর্তিত প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। তাই ফোন রেজিস্ট্রেশনসহ ডিজিটাল নিরাপত্তা নীতিগুলো আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অংশ। প্রবাসীদের জন্য সুবিধা বাড়ানো এবং একই সঙ্গে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা—দুটো বিষয়কেই গুরুত্ব দিয়েছে সরকার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব প্রতিরোধে সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি। কারণ ক্ষতিকর তথ্য দ্রুত ছড়ানোর কারণে সমাজে বিভাজন তৈরি হয়। উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের আহ্বান তাই শুধু তথ্যগত স্পষ্টতা নয়, বরং সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রতীক। সত্য যাচাই করে কথা বলা, গুজব ছড়ানো বন্ধ করা এবং আইন সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখা—এগুলোই একজন দায়িত্বশীল প্রবাসী নাগরিকের আচরণ হওয়া উচিত বলে মত বিশেষজ্ঞদের।