চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ৮৭ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরের প্রথম সাত দিনে দেশে গড়ে প্রতিদিন এসেছে ১২ কোটি ৫১ লাখ ডলার। এ বিষয়ে সোমবার (৮ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের জানান, এই অর্থ প্রবাহ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত বছরের প্রথম সাত দিনে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ছিল ৬১ কোটি ৬০ লাখ ডলার।
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। আরিফ হোসেন খান জানান, শুধু চলতি মাসেই নয়, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে এসেছে ১ হাজার ৩৯১ কোটি ৫০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স। যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮.৪০ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে ৭ ডিসেম্বর একদিনে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ২৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
গত কয়েক মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের নভেম্বর মাসে দেশে এসেছে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স ২৮৮ কোটি ৯৫ লাখ ২০ হাজার ডলার। তার আগে অক্টোবর ও সেপ্টেম্বর মাসে যথাক্রমে ২৫৬ কোটি ৩৪ লাখ ৮০ হাজার এবং ২৬৮ কোটি ৫৮ লাখ ৮০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। জুলাই ও আগস্ট মাসেও যথাক্রমে ২৪৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার এবং ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ৯০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স দেশে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রবাসী শ্রমিকরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে ধারাবাহিক বৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সংরক্ষণ, বিনিয়োগ ও খরচ ব্যবস্থাপনায় সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের মানুষের জীবনযাত্রা, পরিবার-পরিজন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন মোট ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৩২ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। এটি দেশের ইতিহাসে এক নির্দিষ্ট অর্থবছরে সর্বোচ্চ রেকর্ড হিসেবে ধরা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্রবৃদ্ধি প্রবাসীদের আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার মূল্যায়ন উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নেই নয়, পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও আবাসনের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে এই অর্থের সরাসরি প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, রেমিট্যান্স দেশের জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, প্রবাসী আয় বাড়লে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পায়। এছাড়া, বিনিয়োগ ও খরচের জন্য পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ থাকায় মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতেও সহায়ক ভূমিকা রাখে। প্রবাসী আয় বাড়ানোর মাধ্যমে সরকারের বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনাও সহজ হয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের ব্যাংকিং খাতও উল্লেখযোগ্যভাবে উপকৃত হচ্ছে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ সরাসরি ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে আসায় দেশের আর্থিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবাসী শ্রমিকরা দেশে পাঠানো রেমিট্যান্স কেবল পরিবার ও দেশের জন্য নয়, দেশের আর্থিক খাত ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মোট মিলিয়ে, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের এই রেকর্ড রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরে প্রবাসী আয় আরও বাড়তে পারে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ আরও শক্তিশালী হবে।